প্রথম পাতা প্রবন্ধ শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং শ্রীমা সারদার স্নেহধন্য ‘গৌরী মা’

শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং শ্রীমা সারদার স্নেহধন্য ‘গৌরী মা’

5 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

“তুই কাকে বেশি ভালোবাসিস?”

অন্য কেউ হলে এই প্রশ্ন শুনে বিব্রত বোধ করতেন। উত্তরই দিতে পারতেন না সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু তিনি ছিলেন অতি শিক্ষিতা, সুগায়িকা, গভীর মননশীল এক অতি উচ্চ সাধনমার্গের মানুষ। তাই তিনি স্বকণ্ঠে গান গেয়েই সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন সেদিন—“রাই হতে তুমি বড় নও হে বাঁকা বংশীধারী;/ লোকের বিপদ হ’লে ডাকে মধুসূদন ব’লে।// তোমার বিপদ হ’লে পরে বাঁশিতে বলো রাইকিশোরী…।।”

যেমন প্রশ্ন, ঠিক তেমনই উত্তর। সেখানে উপস্থিত সেদিন তখন স্বয়ং শ্রীমা সারদামণি। তিনি লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠে, অনিন্দ্যসুন্দর স্মিত লজ্জাস্নাত হাসি হাসতে হাসতে যিনি গানে গানে উত্তর দিলেন, তাঁর মুখ চেপে ধরেছিলেন। তিনিও আপ্লুত, আহ্লাদিনী হয়ে শ্রীমাকে জড়িয়ে ধরলেন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়।

এখানে উল্লেখ্য, যিনি প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি স্বয়ং পরমপুরুষ শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং যিনি গানের কথায় কথায় উত্তর দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন শ্রীমায়ের অন্যতমা সহচরী, অষ্টসখীর অন্যতমা সখী “গৌরী-মা”, তথা “গৌর-মা”। সেদিন শ্রীমায়ের উপস্থিতিতেই এই প্রশ্ন এবং উত্তরের শেষে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব হার মেনে মধুর হেসে স্থান ত্যাগ করেছিলেন।

আজন্ম সাধিকা এই গৌরী মায়ের জন্ম হাওড়ার শিবপুরে। বাবা ছিলেন পার্বতী চরণ চট্টোপাধ্যায় এবং মা ছিলেন গিরিবালা দেবী। গৌরী মায়ের পূর্বাশ্রমের নাম ছিল “মৃণালিনী”, মেয়েকে আদর করে মা ডাকতেন, “মৃড়ানী” নামে। সন্ন্যাস নেওয়ার পর নাম হয় “গৌরী-পুরী”। তাঁর শৈশবকাল থেকেই দিব্যদর্শন লাভ হয়। বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনাও ঘটতে থাকে জীবনে সেই ছোট্টবেলা থেকেই। বাল্যকালেই তিনি এক সাধকের কাছে দীক্ষাপ্রাপ্তা হন। কিছুদিন পরে তিনি যখন বালিকা, তখন এক ব্রজরমণী সাধিকা তাঁকে একটি “দামোদর শিলা” (শালগ্রাম শিলা) দিয়েছিলেন নিত্য ভক্তিসহ পুজো করার জন্য। তিনি সেই নির্দেশ অতি নিষ্ঠা সহকারে পালনও করতেন। তিনি সংকল্প গ্রহণ করেন যে ঐ “নারায়ণ শিলা”-কেই পতি হিসাবে গ্রহণ করে জীবনে কখনও বিবাহ করবেন না।

গৌরী-মার জন্মদায়িনী মা ছিলেন সেই যুগের একজন অতি সুশিক্ষিতা মহিলা। তাঁর কাছেই ছোটবেলায় গৌরী মা শিখেছিলেন বাংলা, সংস্কৃত ভাষা, ইংরেজি ও ফারসি ভাষা। মায়ের তত্ত্বাবধানেই প্রথমে একটি মিশনারি বালিকা স্কুলে, পরে হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়ে তিনি লেখাপড়া শিখেছিলেন।

গৌরী-মা ছিলেন অসাধারণ মেধাসম্পন্না এক মহিলা। নিজের ঐকান্তিক চেষ্টায় আর অধ্যবসায়ে তিনি গীতা, চণ্ডী, বাইবেল, কোরান, দেবদেবীর স্তুতি, রামায়ণ, মহাভারত এবং ব্যাকরণ সম্বন্ধে জ্ঞানার্জন করেছিলেন।

তাঁর জীবন এক অন্য অনন্য খাতে বইতে থাকে। তখন তিনি ১৩ বছরের কিশোরী, আত্মীয়ারা তাঁকে বিয়ের জন্য বললে, তিনি সরাসরি প্রবল আপত্তি করেন। শত সহস্র কথাতেও তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।

সেই যুগে এহেন জেদী সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা ছিল প্রচণ্ড একটা কঠিন ব্যাপার। কিন্তু তিনি ছিলেন এক অনন্যসাধারণ মানসিক শক্তিসম্পন্ন মহিলা। তাই অনেক বাধা, বিঘ্ন, সমস্যা-সঙ্কুল পরিস্থিতি অতিক্রম করে অবশেষে একদিন মা-বাবাকে জানিয়েই একদল সন্ন্যাসিনী এবং সন্ন্যাসীদের সাথে সন্ন্যাসিনী-যোগিনী হয়ে চলে যান হরিদ্বারের তীর্থক্ষেত্রে। সেখানে তিনি “গৌরী-মা” নামে পরিচিতা হন।

তারপর বেশ কয়েক বছর নানা তীর্থক্ষেত্র পরিভ্রমণ করেন তিনি। এরপর ঘটনাচক্রে দীর্ঘকাল পরে তিনি আবার পিতৃগৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু সন্ন্যাসিনী যোগী গৌরী-মার পক্ষে আত্মীয়স্বজনের সাথে সংসার জীবনে বাস করা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি পুরীর শ্রীক্ষেত্রে চলে যান। পরে কলকাতায় তিনি স্বপ্নাদেশ মতো আসেন।

এরপরের ঘটনা এক নাটকীয়। গৌরী মায়ের সাথে পরিচয় ঘটে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের গৃহী ভক্ত বলরাম বসুর সাথে। বলরাম বসু তাঁকে শ্রী রামকৃষ্ণ দর্শনে যেতে অনুরোধ করেন। কিন্তু গৌরী মা বলেন যে, তিনি জীবনে অনেক সাধু দর্শন করেছেন, নতুন কোনও সাধু দর্শনের সাধ নেই। তিনি বলেছিলেন—“শোন বাবা, তোমার সাধুর যদি ক্ষমতা থাকে, আমায় টেনে নিয়ে যান—তার আগে আমি যাচ্ছি নে।”

কী অলৌকিক ঘটনা এরপরে। সত্যিই পরমপুরুষ শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তাঁকে টেনে নিয়ে এলেন সেই মহাতীর্থেই, যার নাম “মহাসাধনপীঠ দক্ষিণেশ্বর”।

শ্রী রামকৃষ্ণকে প্রথম দেখাতেই গৌরীমা অন্তরসর্বসত্তাতে অনুভব করলেন যে—ওই মূর্তিই তো তাঁকে সেই কবে থেকে অন্তরে অন্তরে আকর্ষণ করছিল। গৌরী মা মনে মনে প্রণাম করলেন। প্রথম দিন এসেছিলেন বলরাম বসুর সাথে, গৌরীমা-কে দেখেই ঠাকুর বলেছিলেন—“তোর কথাই ভাবছিলুম।” সেদিন আর কোনও কথা হয়নি। কিন্তু অন্তরের অন্তঃসত্ত্বায় এক অমোঘ আকর্ষণেই গৌরীমা পরের দিনই একা এলেন মা ভবতারিণীর শক্তিসাধন পীঠ দক্ষিণেশ্বরে।

শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব গৌরীমা-কে শ্রীমা সারদা দেবীর কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন—“ওগো ব্রহ্মময়ী, জগজ্জননী, একজন সঙ্গিনী চেয়েছিলে, এই নাও তোমার সেই অষ্টসখীর প্রথম সখী।”

এরপর থেকে গৌরী মা দক্ষিণেশ্বরে শ্রীমা সারদার কাছেই বসবাস করতেন।

শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব গৌরীমা-কে মানুষের সেবা ধর্মের কাজে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ গৌরী মা-কে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। অনেক জ্ঞান, পরামর্শ নিতেন তিনি সন্তানের মতো, ভাইয়ের মতো।

এরপর একদিন তিনি শ্রীমা এবং শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব-এর সাথে কথা বলে চলে যান হিমালয়ের এক নির্জন স্থানে কঠোর তপস্যায় মগ্ন হতে।

ঠাকুরের মহাসমাধির অনেক দিন পরে শ্রীমা অনেক তীর্থ করতে করতে বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন, তখন গৌরী মা-র সাথে শ্রীমায়ের সাক্ষাৎ হয়েছিল। শ্রীমা বলেছিলেন—“ঠাকুর বলে গেছেন তোমার জীবন ‘জ্যান্ত জগদম্বা’-দের কাজে লাগবে। তুমি শিক্ষে দাও, রক্ষে করো মেয়েদের।” শ্রীমার প্রেরণাতেই ১৩০১ বঙ্গাব্দে (১৯০৭ সালে) গৌরী মা “শ্রীশ্রী সারদেশ্বরী আশ্রম” প্রতিষ্ঠা করেন। সম্পূর্ণ নারীদের উদ্যোগে সেই আশ্রম গড়ে ওঠে। সেই আশ্রমের কাজ হল, নারীশিক্ষার প্রসার করা, বিদ্যালয়ে শিক্ষা দেওয়া, অসহায় মহিলাদের আশ্রয় দেওয়া, তাঁদের রক্ষা করা, তাঁদের জীবন-জীবিকায় সাহায্য করা, প্রতিষ্ঠিত করা, অসুস্থ, দুঃস্থ মহিলাদের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি।

এরপর শোনা যায় শ্রীমায়ের মহাসমাধির পরে গৌরী মা চলে যান হিমালয়ে সাধনায়। আর ফেরেননি লোকালয়ে।

জগতের সামগ্রিক কল্যাণে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং শ্রীমা সারদা দেবীর এই মহাজাগতিক অলৌকিক অবদান আমাদের অন্তরে অন্তরে পুজিত হোক। পুজিত হোক আজন্ম যোগী সন্ন্যাসিনী, ঠাকুর এবং শ্রীমার আশীর্বাদধন্য, স্বামী বিবেকানন্দের, স্বামী ব্রহ্মানন্দের এবং ঠাকুরের সাক্ষাৎ শিষ্য, ভক্তদের শ্রদ্ধেয় গৌরী মা আমাদের অনুভবে, আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধায়, প্রণামে।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.