প্রথম পাতা প্রবন্ধ রবি-পাঠ: স্যার গ্যারি সোবার্স: ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অনন্য মহাকাব্যের অবসান

রবি-পাঠ: স্যার গ্যারি সোবার্স: ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অনন্য মহাকাব্যের অবসান

22 views
A+A-
Reset

ডন ব্র্যাডম্যানের চোখে— “মানুষ এবং ক্রিকেটার হিসাবে সেরার সেরা হলেন সোবার্স।” রিচি বেনো বলেছিলেন— “সোবার্স একটাই হয়, যিনি জানেন ইতিহাস কী করে সৃষ্টি করতে হয়।”

সেই সোবার্স নিয়তির অমোঘ বিধানে মহাপ্রস্থানের পথে চিরবিদায় নিলেন ১৭ জুলাই, ২০২৬।

সোবার্সের নাম জড়িয়ে আছে শুধু ক্রিকেটীয় ইতিহাসে নয়, শুধু একের পর এক অনন্যসাধারণ ঐতিহাসিক ক্রিকেট রেকর্ড গড়ার জন্য নয়; তিনি মিশে আছেন ভারতীয় তথা আমাদের বাংলার সংস্কৃতিতেও। মনে পড়ে, ‘জয়জয়ন্তী’ নামে একটি বাংলা সিনেমায় ‘সোবার্স’-এর নাম গানে গানে মিশে আছে। মিশে আছে ‘ধন্যি মেয়ে’ নামে বাংলা সিনেমার ধারাবিবরণীতেও। আসলে গত শতকের পঞ্চম দশক থেকেই আমাদের বাংলায় এই কিংবদন্তি সফল ব্যাটসম্যান, বোলার, ফিল্ডার এবং অধিনায়ক হিসেবে ভালোবাসার প্রিয় মানুষ। আর একজন মানুষ হিসেবে তো তিনি অজাতশত্রু, হৃদয়বান ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সে কথা সারা বিশ্বই জানে।

১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বার্বাডোজের ব্রিজটাউন শহরে এক দরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। পুরো নাম গার্ফিল্ড সেন্ট অব্রুন সোবার্স। তাঁর বাবা থেলমা সোবার্স ছিলেন পেশায় পুলিশ এবং তিনিও ক্লাব ক্রিকেট খেলতেন। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি নিহত হন। তখন আমাদের পরিচিত গ্যারি সোবার্সের বয়স পাঁচ কি ছয়।

গ্যারির দু’হাতে জন্ম থেকেই ছ’টি করে আঙুল ছিল। পরে অস্ত্রোপচার করে তা ঠিক করা হয়।

ক্রিকেটে হাতেখড়ি হয়েছিল গ্যারির কৃষ্ণাঙ্গদের স্থানীয় একটি ক্লাবে। ১৯৫৩ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আবির্ভাব। কিছুদিন পরে ভারতের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে তাঁকে নেটে বোলিং করার জন্য ডাকা হয়। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে গ্যারির প্রথম শিকার ছিলেন ভারতের পলি উমরিগড়।

এরপর তাঁকে বাঁহাতি অর্থোডক্স বোলার হিসেবে ওই বছরই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টে খেলার জন্য ডাকা হয়, অন্য খেলোয়াড় আলফ ভ্যালেন্টাইন অসুস্থ থাকার কারণে। অভিষেক টেস্টে তিনি চারটি উইকেট নিয়েছিলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক কিংবদন্তি ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের হাত ধরে গ্যারি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে তিনি প্রথম শতরান করেন। তবে সেদিন শুধু শতরানেই থেমে থাকেননি গ্যারি। তিনি যখন মাঠ ছাড়েন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত রান ছিল ৩৬৫ অপরাজিত। সেদিন তিনি গড়েছিলেন বিশ্বের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম বিশ্বরেকর্ড। সুদীর্ঘ ৩৬ বছর এই রেকর্ড অক্ষত ছিল। পরে, ১৯৯৪ সালে গ্যারির স্বদেশীয় ব্যাটসম্যান ব্রায়ান লারা ৩৭৫ রান করে সেই রেকর্ড ভাঙেন।

গ্যারি মানেই বিশ্বরেকর্ড। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। ৯৩টি টেস্টে ২৬টি শতরান-সহ ৮,০৩২ রান, যা ছিল সেই সময়ের বিশ্বরেকর্ড। ১৯৬৮ সালে নটিংহ্যামশায়ারের বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এক ওভারের ছয়টি বলেই ছয় মেরে এক ওভারে ৩৬ রান তোলার প্রথম বিশ্বরেকর্ডও তাঁর। ৯৩টি টেস্টে শুধু ব্যাটিং নয়, তিনি ২৩৫টি উইকেটও তুলে নিয়ে প্রথম অলরাউন্ডার হিসেবে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। টেস্ট ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট মিলিয়ে তিনি ২০ হাজারেরও বেশি রান করেন এবং এক হাজারেরও বেশি উইকেট সংগ্রহ করেন। টেস্টে ১০৯টি ক্যাচ ধরে তিনিই প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে এই নজির গড়েন।

গ্যারির নাম যুক্ত হয়েছে ‘উইজডেন ক্রিকেটার অব দ্য ইয়ার’-এর সঙ্গে। স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে তাঁর নাম ‘উইজডেন ক্রিকেটার অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে। তিনি পেয়েছেন আইসিসির সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মান ‘স্যার গার্ফিল্ড সোবার্স অ্যাওয়ার্ড’— যে পুরস্কার তাঁরই সম্মানে নামাঙ্কিত।

স্যার গ্যারি সোবার্সের মহাপ্রয়াণে সারা বিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ শোকাহত। স্মৃতির স্মরণিকায় বরণীয় হয়েই থাকবেন গ্যারি সোবার্স চিরকাল— এ কথা অনস্বীকার্য।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল এক শোকবার্তায় জানায়—

“স্যার গ্যারি সোবার্স, আপনি চিরকাল আমাদের অন্তরের অন্তঃস্থলে অমর হয়ে থাকবেন।”

আমাদের ভারতবর্ষের, আমাদের বাংলার শ্রদ্ধা রইল স্যার গ্যারি সোবার্সের স্মরণে ও বরণে।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.