প্রথম পাতা প্রবন্ধ কচুরি-সিঙ্গারা চেয়েছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিপ্লবী বীরেন দত্তগুপ্ত!

কচুরি-সিঙ্গারা চেয়েছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিপ্লবী বীরেন দত্তগুপ্ত!

15 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

আজ কচুরি, সিঙ্গারা খেতে খুব ইচ্ছে করছে। দিন না একটু ব্যবস্থা করে। কোর্টের ক্যান্টিন থেকে…”

ভিড়ে ঠাসা কোর্ট অবাক চোখে তাকিয়ে সেই সদ্য সাজা রায় ঘোষণা-প্রাপ্ত যুবকের দিকে। কী আশ্চর্য! এই ছেলে কি ধাতুতে তৈরি গো? মুখে কী অমলিন সুন্দর স্মিত হাসিখানা! দ্যাখো দ্যাখো… পরস্পর বলাবলি চলছে।

তৎক্ষণাৎ বিচারকের আদেশে খবর গেল লালবাজার হেডকোয়ার্টারে। সেখান থেকে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এল পুলিশ কমিশনার কুখ্যাত চার্লস টেগার্ট। দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ গোয়েন্দা আধিকারিকদের বললেন—“হ্যাঁ হ্যাঁ। যা খেতে চাইছে, তাই ওকে দেওয়া হোক। ওর ইচ্ছা পূরণ করা আমাদের ডিউটি।”

সেই যুবকের কানে যেতেই কথাটা, সে স্মিত হেসে বলল—“সাহেব, আমার মনের যা ইচ্ছা, তা আমি পূরণ করে ফেলেছি, প্রায় এক মাস আগে, তোমার জুতোর সোল শামসুলকে নিকেশ করে। এখন তুমি কচুরি-সিঙ্গারার বন্দোবস্ত করো তো, দেখি বাপু, খুব খিদে পেয়েছে।”

সবাই বিস্মিত। কী দুঃসাহসিক বীর এই ছেলে! কী ধাতুতে তৈরি এ ছেলে?

ব্রিটিশ প্রশাসনের সি.আই.ডি. বিভাগের দাপুটে ডি.এস.পি. শামসুল আলম। ব্রিটিশ সরকারের পদলেহী লোভী অফিসার। টেগার্টের পা-চাটা। টেগার্টও খুব পছন্দ করে তার বশংবদকে। যত অন্যায়, জঘন্য কাজ শামসুলকে দিয়ে করায়। সেও সত্য-মিথ্যা সাজিয়ে সেই সময়ের স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত বিপ্লবীদের উপরে অত্যাচার চালাত, ব্রিটিশকে খুশি করতে।

এই শামসুল আলম অনেক দুর্ব্যবহার, অত্যাচার করেছিল অরবিন্দ ঘোষ-সহ অন্যান্য বিপ্লবীদের প্রতি। আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলার ইনভেস্টিগেশন অফিসার ইয়ার্ডলি নর্টনকে সত্য-মিথ্যা নানান তথ্য সাজিয়ে। তাই এক সময়ে বিপ্লবীদের চক্ষুশূল হয়ে উঠল এই শামসুল। ওকে উচিত শিক্ষা দিতেই হবে। কিন্তু কী করে তা হবে? শামসুল তো বিরাট সুরক্ষা বলয়ের মধ্যেই থাকে সারাক্ষণ। তার ধারেকাছে যাওয়ার দায়িত্ব নেবে কে? কার এত বুকের পাটা? আর ধরা পড়লে তো নিশ্চিত মৃত্যু। কে যাবে মরণের সঙ্গে বাসরশয্যা রচনা করতে? কে পারবে এক হাতে শত্রুর গলার টুঁটি চেপে ধরে আর এক হাতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে? কে? কে পারবে?

“হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি, আমি, আমিই পারব…”

এগিয়ে এল অবিভক্ত বাংলার ঢাকার এক তরুণ, বাঘা যতীনের প্রিয়পাত্র ১৯ বছরের বীরেন দত্তগুপ্ত। উপস্থিত সবাই তাকিয়ে তার দিকে।

পারবি?

তার বলিষ্ঠ জবাব—“হ্যাঁ হ্যাঁ, পারব।”

সিদ্ধান্ত হল, তবে সেই-ই দায়িত্ব নিক। তখন কী আনন্দ তার! সে তার বুকপকেটে রাখা একটি ছবি বার করে কপালে ঠেকিয়েই বারবার চুমু খেতে লাগল ছবিতে। সবাই দেখতে চাইল সেই ছবি—স্বামী বিবেকানন্দ। ভারতের জাগৃতির পথিকৃৎ। উপস্থিত সকলেই প্রণাম করে সমস্বরে ধ্বনি দিয়ে উঠল—“বন্দে মাতরম” / “জয়তু স্বামী বিবেকানন্দ”।

সামনে জ্বলছে শপথ গ্রহণের সাক্ষী অগ্নিকুণ্ড। ধ্বনিত হচ্ছে—“বন্দে মাতরম / জয়তু স্বামী বিবেকানন্দ”।

ওদিকে শামসুল আলম যথানিয়মে স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত বীর বিপ্লবীদের উপরে লাগাতার অত্যাচার চালিয়েই যাচ্ছে। ব্রিটিশ পুলিশ তাকে মদতও দিয়ে যাচ্ছে পূর্ণদমে। এদিকে ঘুমিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরির অগ্নিতেজে ফুঁসছে বিপ্লবীদের শপথের আগুন। ছড়া তৈরি হল—“শামসুল, তুমি ব্রিটিশের শ্যাম, আমাদের শূল / শিগগিরই তোমার ভিটেয় চড়বে ঘুঘু, দেখবে চোখে সর্ষেফুল।”

কিন্তু শামসুলকে চিনাবে কে? দায়িত্ব নিলেন সতীশচন্দ্র সরকার। যথাসময়ে চেনানো হল। কিন্তু অস্ত্র? অস্ত্র কোথায় পাওয়া যাবে? চারদিকে যা নজরদারি, যা তল্লাশি চলছে। খুব গোপনে অস্ত্রের ব্যবস্থা করলেন সুরেশচন্দ্র মজুমদার (পরবর্তীতে ইনি আনন্দবাজার পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা), যিনি ছিলেন বিপ্লবী বাঘা যতীনের (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। সুরেশচন্দ্র আর বাঘা যতীনের পরিচয় হয়েছিল কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা বাঘা যতীনের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আইনজীবী ললিত চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে (এই ললিতবাবু হলেন অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পর্কে দাদু, বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রের সম্পর্কে কাকা)।

শামসুলকে চেনানো হল, অস্ত্রও পাওয়া গেল। তৈরি বিপ্লবী বীরেন দত্তগুপ্ত—বুকে তাঁর স্পন্দিত “স্বামী বিবেকানন্দ”, উচ্চারিত “বন্দে মাতরম”।

এবার এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—১৯১০ সালের ২৪ জানুয়ারি। আলিপুর কোর্ট থেকে বেরচ্ছে শামসুল আলম, দু’পাশে সুরক্ষা বলয়—হঠাৎ তারই মধ্যে শামসুলের মুখোমুখি মৃত্যুদূত—বিপ্লবী বীরেন। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি—শামসুল আলমের বুকের মধ্যে চরম আক্রোশে ফেটে পড়ল, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল সব। একেবারে খতম দেশদ্রোহী—জাতির শত্রু—বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর-বিভীষণ, শয়তান শামসুল আলমের হিসেব-নিকেশ।

না, সেদিন পালায়নি বীরেন। গ্রেফতার হয়েছেন। শুরু হয়েছিল অকথ্য অত্যাচার। না, মুখ দিয়ে একটা কথাও বার করতে পারেনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকারের পুলিশ গোয়েন্দারা কেউই।

বিচারের নামে প্রহসন। অবশেষে রায় বেরল—২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯১০ সালে বীরেনের মৃত্যুদণ্ডের দিন স্থির হল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলেই।

সেই রায় শোনার পরেই বীরেনের খুব খিদে পেয়েছিল। তাই সে চেয়েছিল—“আজ কচুরি-সিঙ্গারা খেতে খুব ইচ্ছে করছে। দিন না একটু ব্যবস্থা করে কোর্টের ক্যান্টিন থেকে…।”

সবাই অবাক। এমনকি বিচারকও। আইনজীবীরাও। কারও কারও চোখ ঝাপসাও হয়ে উঠেছিল সেদিন।

“মুক্তির মন্দির সোপান তলে…” নিবেদিত দেশের স্বাধীনতার জন্যে, দেশমাতৃকার অপমানের সমস্ত প্রতিশোধে, প্রতিরোধে আত্মবলীদান দিলেন বীর বিপ্লবী বীরেন দত্তগুপ্ত (২০শে জুন, ১৮৮৯ // ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯১০)।

সারা বিশ্বে একমাত্র বোধহয় অভিশপ্ত জাতি হলাম আমরা, বাঙালি তথা ভারতীয়রা। তাই আমাদের ইতিহাস মাখামাখি করেছে, মাতামাতি করেছে সাজানো মিথ্যা দিয়ে। যখন ইতিহাসে নেহরু-গান্ধীরা পরিচিতিই পাননি, তার বহু আগে থেকে স্বাধীনতার জন্য আত্মঅবলিদান দিয়েছেন যারা, তাদের সেই সত্য ইতিহাস এক গভীর ষড়যন্ত্রের কারণে হারিয়েই গেল। এ এক চরম অন্যায়, অপরাধ। যারা ইতিহাসকে অপমান করে, তারা কি দেশপ্রেমিক? না তারা দেশদ্রোহী?

এ বিচার করবে সময়, এ বিচার করবে মানুষ।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.