আর আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখা যাবে না লিয়োনেল মেসিকে। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর ঘোষণা করলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। সোমবার সমাজমাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে মেসি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, জাতীয় দলের হয়ে তাঁর দীর্ঘ যাত্রার শেষ এসে গিয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালই দেশের হয়ে তাঁর শেষ ম্যাচ হয়ে থাকল।
“সময় এসে গিয়েছে”—অবসরের সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে এই কথাই লিখেছেন মেসি। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা চলছিল। অগস্টের শুরুতেও জাতীয় দলের হয়ে আর কতদিন খেলবেন, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৩৯ বছর বয়সে এসে সেই জল্পনার অবসান ঘটালেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
মেসির এই সিদ্ধান্ত অবশ্য হঠাৎ করে নেওয়া নয়। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর থেকেই অবসর নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন তিনি। মেসি জানিয়েছেন, ফাইনালের দু’দিন পর, ২১ জুলাই নিজের ডায়েরিতে অবসরের বার্তা লিখেও ফেলেছিলেন। তবে তখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। এর পর ব্যক্তিগত জীবনে বাবার অসুস্থতা ও মৃত্যুর ধাক্কা আসে। সেই কঠিন সময় পেরিয়ে অবশেষে নিজের সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে আনলেন তিনি।
বিদায়ী বার্তায় মেসি জানিয়েছেন, জাতীয় দলের হয়ে খেলার সময় তিনি সবসময় নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন। শুধু সাফল্যের সময় নয়, কঠিন সময়েও দেশের জার্সির প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল একই রকম। জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগকে নিজের ফুটবলজীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হিসাবেই দেখেছেন তিনি।
মেসির বার্তায় ছিল ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও। জাতীয় দলে একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলার উঠে আসছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁদের জন্য জায়গা করে দেওয়ার সময় এসেছে বলেই মনে করছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
তবে বিদায়ের মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আবেগ ছিল সমর্থকদের উদ্দেশে তাঁর কথায়। প্রায় ২০ বছর ধরে যে সমর্থন তিনি পেয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মেসি। জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নেমে আর সমর্থকদের সেই গর্জন শুনতে পারবেন না—এই অভাব অনুভব করবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। এবার থেকে মাঠের বাইরে থেকেই আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করবেন তিনি।
২০ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলের হয়ে অভিষেক হয়েছিল মেসির। এরপর কেটে গিয়েছে দুই দশকেরও বেশি সময়। দেশের হয়ে খেলেছেন ২০৭টি ম্যাচ, করেছেন ১২৫টি গোল। ছ’টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মেসি আর্জেন্টিনাকে তিন বার বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন।
২০১৪ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। সেই আক্ষেপ মুছে যায় ২০২২ সালে। কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন মেসি। অধিনায়ক হিসাবে হাতে ওঠে বহু কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ।
শুধু বিশ্বকাপ নয়, আর্জেন্টিনার হয়ে কোপা আমেরিকাতেও সাফল্য পেয়েছেন মেসি। একসময় জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনও ট্রফি না জেতার জন্য যে ফুটবলারকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল, কেরিয়ারের শেষ পর্যায়ে তিনিই হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার অন্যতম সফল অধিনায়ক।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল তাই হয়ে রইল এক যুগের শেষ অধ্যায়। দেশের হয়ে শেষ ম্যাচে ট্রফি হাতে উঠল না। কিন্তু তার আগেই আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ী করে ফেলেছেন মেসি।
২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল, ছ’টি বিশ্বকাপ এবং ২০২২-এর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন—আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিয়োনেল মেসির দীর্ঘ রূপকথার শেষ হল।