পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
সেদিনও ছিল এমনই দিন, এক রবিবার, ২৯শে আগস্ট, ১৯৭৬ সাল।
রবিবাসরীয় দিনে বাঙালি বাজারহাটে ব্যস্ত। ছুটির দিনের আয়েসী, গড়িমসি ভাব। বেশ একটা ফুরফুরে মেজাজ বাঙালির মনে, ভাবনায়, আড্ডায়, সংসারে। হঠাৎ নেমে এলো বিষাদ-বিধুর এক খবর—আর নেই কাজী নজরুল ইসলাম।
১৯৭১-এ জন্ম নিয়েছিল খণ্ডিত পূর্ব পাকিস্তানের বুকে স্বাধীন বাংলাদেশ। নায়ক বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালে নজরুলের জন্মদিনের আগের দিন বাংলাদেশ সরকার কলকাতা থেকে ঢাকায় নিয়ে গেল কবিকে। সম্বর্ধনা দেবেন। স্বয়ং বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরে কবিকে আনতে উপস্থিত। বাংলাদেশের চারিদিকে সে এক উৎসব। ঢাকা রেডিওতে কবির বিমানবন্দর থেকে ধানমন্ডিতে কবির জন্য বরাদ্দ বাড়ি অবধি যাত্রাপথের ধারাবিবরণী। তারপর বোঝা গেল, কবিকে ওখানেই রাখার, মানে কবির থাকার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। মাসিক বন্দোবস্ত, গাড়ি, পুলিশ প্রহরা, পরিচারক প্রভৃতির সবকিছুর বন্দোবস্ত এবং আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান কবিকে গান শুনিয়ে যেতেন প্রতিদিন। এসবই এমন এক কবির জন্য, যিনি রোগের নাগপাশে আবদ্ধ হয়ে তখন মূক, প্রায় অবোধ। শুধু অবাক দুটি চোখে তাকিয়ে থাকেন নিষ্পন্দ দৃষ্টিতে। ১৯৭৩-এর ২১শে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে কবিকে সম্বর্ধনা দেওয়া হল। কিন্তু “ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি”? এই গানের কথা যেন বাঙালির মনের মধ্যে বিষণ্ণ ব্যথা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
খণ্ডিত বাংলার সংস্কৃতিতে অখণ্ডিত কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৪৭-এর পরে অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছিলেন—”ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/ আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে/ ভাগ হয়নিকো নজরুল..।”
গত বিশ শতকের কুড়ি ও তিরিশের দশক অখণ্ডিত বঙ্গ জন্মভূমি যে ধূমকেতুকে বিষের বাঁশিতে বিপ্লবের আর প্রতিবাদের গান কবিতার সৃষ্টিতে বিদ্রোহী সুখের উল্লাসে উন্নত শিরে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন, সেই নজরুল কবে কখন চলে গেছে স্তব্ধতার, নিঃশব্দতার গভীরে। কেউ জানতে পারেনি।
এ কি নিয়তির এক পূর্ব লিখন? কারণ জন্মভূমি মানচিত্র ছিন্নভিন্ন করা বোধহয় নজরুল সহ্য করতে পারতেন না।
ভাবলে সত্যিই অবাক হতে হয়, কী সমাপতন। পরাধীনতার গ্লানিবোধ ভেঙে স্বাধীনতার জন্য বিপ্লবের ডাক দিয়েছিল এই আগস্ট, জন্মভূমি দ্বিখণ্ডিত হল এই আগস্টেই। সহ্য করতে না পারার অনুচ্চারিত ইচ্ছায় নিয়তির অমোঘ বিধানে তাই বোধহয় এই আগস্টেই চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথ। আর আজ থেকে ৫০ বছর আগে এই আগস্টেই চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথ-এর স্নেহধন্য “উন্মাদ ধূমকেতু” কাজী নজরুল ইসলাম। যিনি লিখতে পেরেছিলেন—
“আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আজ আলোর নাচন/রূপ দেখে শিব বুক পেতে দেয়, যার হাতে মরণ বাঁচন।”
পাশাপাশি
“রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ রে..”
তিনি লিখেছেন—”কামাল পাশা”, আবার তিনিই লিখলেন “বীর সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ”। লিখলেন “একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান।” কিন্তু কী অভাগা এই বাঙালি জাতটা? কাজী নজরুল, রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করতে পারল না মননের উৎকর্ষতায়। শুধু খুঁজে গেল—কে বড়, আলি না কালী?
২৯শে আগস্ট চলে গেলেন নজরুল। ৩০শে আগস্ট নজরুলকে সমাধিস্থ করা হল ঢাকায়।
এ সবই আজ অতীত। তবু, স্মৃতি দাঁড়িয়ে থাকে সময়ের সরণিতে।
যেমন, নজরুলের বহু সময় অতিবাহিত করা এই কলকাতার স্মৃতিতে রয়ে গেছে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ৩০শে আগস্ট কলকাতার রবীন্দ্রসদনে নজরুল স্মরণ। সেদিন প্রবীণা আঙুরবালা দেবীর কান্নাভেজা কণ্ঠে গাওয়া গান, যে গান তিনি তাঁর কাজী-দার কাছেই শিখেছিলেন—”পূজার থালায় আছে আমার ব্যথার শতদল।” সবিতাব্রত দত্ত উদাত্ত কণ্ঠে গেয়েছিলেন—”দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার হে..”
সেদিন শোকস্তব্ধ বাংলা ও বাঙালি বোধহয় তার অখণ্ড মানচিত্রকে যারা ষড়যন্ত্রের শিকার হিসাবে দ্বিখণ্ডিত করেছিল, তাদের প্রতি এক অমোঘ প্রতিবাদী ক্ষমা রেখেই বলেছিল—”ভাগ করেছো জন্মভূমি, সীমান্তের কাঁটাতারে, কিন্তু ভাগ করতে পারোনি, বাঙালির মা-আম্মি, পান্তা, দিন রাত,/ ঠিক তেমনই শত ষড়যন্ত্রে ভাগ করতে পারবেই না, বাঙালির রক্তে মিশে থাকা বিনি সুতোর মালায় গাঁথা
কাজী নজরুল,
রবীন্দ্রনাথ।”
(শতদল বিবস্বান)