প্রথম পাতা প্রবন্ধ প্রশ্নটা জানা, উত্তরটা জেনেও যেন অজানা

প্রশ্নটা জানা, উত্তরটা জেনেও যেন অজানা

5 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

আজ সারা বিশ্বের জনসংখ্যা ৮৩০ কোটি। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস—এই শতাব্দীর আশির দশকে বিশ্বের জনসংখ্যা পৌঁছাবে ১০৩০ কোটিতে। না, না, আঁতকে উঠবেন না। কারণ পরিবেশ বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, যে এই আশির দশক থেকেই জনসংখ্যা আস্তে আস্তে কমতে শুরু করবে। তার মূল কারণ পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা।

এই যে সম্প্রতি নেপালের বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে গেল, এই রকম মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমরা দীর্ঘদিন ধরেই দেখছি। সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৩ সাল থেকে আমাদের এশিয়া মহাদেশের পাহাড়ি এলাকায় ধারাবাহিকভাবে একের পর এক বিপর্যয় ঘটে যাচ্ছে। শুধু এশিয়াতেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য ভূখণ্ডে যেমন আমেরিকা, পেরু, ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিতে, ইউরোপীয় দেশগুলোতে, আফ্রিকার দেশে দেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে চলেছে। এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম প্রভৃতি অঞ্চলেও প্রাকৃতিক অস্থিরতা ক্রমাগত ক্রমবর্ধমান। প্রায় ১২/১৩ বছর হয়ে গেল, ধারাবাহিকভাবে বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার ঘটনা। কেদারনাথ, উত্তরকাশী, সিকিম, চামোলী, নেপাল, ইত্যাদি ইত্যাদি, নাম প্রতি বছর সংবাদ শিরোনামে উড়ে এসেছে বারবার। আর উঠে এসেছে মারাত্মক ভয়াবহ ধ্বংসের পরিসংখ্যান। মানুষের, প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া হয়েছে, নানান আলোচনা হয়েছে। নানান ব্যর্থতা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ প্রশ্নের প্রতিপ্রশ্নের তুমুল লড়াই হয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। মানে প্রশ্নটা জানা, আর উত্তরটা জানা সত্ত্বেও অজানা, বিশ বাঁও জলে।

মানুষের হঠকারিতায়, মানুষের অত্যন্ত অপরিসীম স্বার্থপরতায়, আর লোভের শিকার হয়েছে প্রকৃতি আর তার স্বাভাবিকতা। তার গতি-প্রকৃতি। বন-জঙ্গল কেটে জনবসতি হয়েছে, কিন্তু বিকল্প অরণ্যায়ন হয়নি। পাহাড়ের বুক ভেদ করে সুড়ঙ্গ কেটে পথ তৈরি হয়েছে মানুষের সুবিধার জন্যে, কিন্তু পাহাড়কে রক্ষা করার দায়বদ্ধতা গ্রহণ করা হয়নি।

মানুষ ভ্রমণপিয়াসী। মানুষের সেই মনের ইচ্ছেকে কিছু ব্যবসায়ী নিজেদের ব্যবসাতে পরিণত করেছে। পাহাড়ের বুকে হোটেল, রাস্তা, এসইউভি, হেলিকপ্টার নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় যাওয়ার নানান ব্যবসায়ী ফাঁদ পেতে রেখেছে ব্যবসায়ীরা। নির্জনতাকে খানখান করে ভেঙে দিয়ে অবৈজ্ঞানিক বিলাসবহুল পরিকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যতা, স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। বিঘ্নিত হচ্ছে পাহাড়, নদী, বনভূমির স্বাচ্ছন্দ্য। প্রকৃতির বুকে জমা হচ্ছে ক্ষোভ। তারপর একদিন প্রকৃতির রোষে শুরু হচ্ছে তার প্রতিশোধ নেওয়ার ধ্বংসাত্মক, প্রলয়ঙ্কর তাণ্ডবলীলা। হারিয়ে যাচ্ছে জনবসতি, শহর, গ্রাম, সংখ্যাহীন মানুষ আর তাদের ঘর-সংসার, পরিবার-পরিজন।

এই আশঙ্কাই আজ সারা বিশ্বের এক জটিল, বহু আলোচিত প্রশ্ন। যদিও প্রশ্নটা সকলেই জানে, কিন্তু তার উত্তরটা কতকটা মানুষের ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, মানুষেরই চারপাশে, কিন্তু তাকে “ধরব ধরব করছি, কিন্তু ধরতে পারছি না”—

তাই আগামী সময় মানুষের সভ্যতায় এক ভয়াবহ সময় সমাগত প্রায়।

এখনো সময় আছে আমাদের সচেতন হওয়ার, অবশ্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ রূপায়িত করার অনস্বীকার্যতা।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.