প্রথম পাতা প্রবন্ধ ঐতিহাসিক রোজা-রমজানের মাস শেষে আসবে পবিত্র খুশির “ঈদ্-উল্-ফিতর্” এবং একটি গান

ঐতিহাসিক রোজা-রমজানের মাস শেষে আসবে পবিত্র খুশির “ঈদ্-উল্-ফিতর্” এবং একটি গান

67 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

বাংলা ক্যালেন্ডার, ইংরেজি ক্যালেন্ডারের মত আরবি ক্যালেন্ডারও আছে। বাংলা ক্যালেন্ডার যেমন শুরু হয় ১৪/১৫ ই এপ্রিল,বৈশাখ মাস থেকে, ঠিক তেমনই আরবি ক্যালেন্ডারও শুরু হয় জুলাই মাসের মাঝখান থেকে। আরবি ক্যালেন্ডারের মাসগুলি হলো–যথাক্রমে, মহরম, সফর, রবিউল আওয়াল, রবিউল সানি, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানি, রজব্, শাবানা, রমজান, সাওয়াল, জিলক্বদ, জিলহজ্জ। সেই হিসাবে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত হলো রমজান মাস।

এই রমজান মাসে সারা বিশ্বের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মানুষ এক ঐতিহাসিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্রত পালন করেন,যার নাম হলো “রোজা”। এই রোজা মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতিটি মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র পালনীয় ব্রত। এই রোজা পালনের প্রধান অঙ্গ হোল সারা রমজান মাসের প্রত্যেক দিন ভোরের বেলায় সূর্য ওঠার আগে রোজা ব্রত পালনকারী ব্যক্তি (নারীপুরুষ সকলেই) হাতমুখ ধুয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে দিনের প্রথম নামাজ পড়ার পরে কিছু খাদ্য আল্লাহ্-র নামে খেয়ে নেবেন।তাকে বলে “সেহর”। এরপর সারাদিন সেই ব্যক্তি একফোঁটা জলও খাবেন না,মুখের লালাথুথুও ঘিঁটবেন না। সারাদিন কোন অন্যায়, অপবিত্র কাজ করবেন না, মনেমনে কোনও রকমের অসাধুতা, খারাপ ভাবনা ভাববেন না। এমনকি স্ত্রীর সাথে শারিরীকভাবে মিলিতও হবেন না, ইত্যাদি ইত্যাদি কঠোরভাবে প্রতিক্ষণ তাঁকে সংযত হয়ে রোজা পালনের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করতে হবে। শেষে দিনান্তে,নামাজ পাঠ করে, রোজা ভাঙার নিয়মবিধি পালন করে আল্লাহ্-র নামে সকলকে খাবার বন্টন করে,সকলের সাথে এক জায়গায় বসে খাদ্য গ্রহণ করবেন। তাকে বলা হয় “ইফতার”।

এই সময়ে প্রতিটি মুসলিম রোজাপালনকারী ব্যক্তি তাদের সাধ্য অনুযায়ী গরীব দুঃখী ভারাক্রান্ত মানুষদের দান-ধ্যান করেন। নিজের প্রয়োজনটুকে রেখে উদ্বৃত্ত সব গরীবদেরকে বিলিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া আছে পবিত্র কুরআন শরীফে।

এককথায় বলা যায়, রমজানের মাসে একমাসব্যাপী রোজা পালনের মধ্য দিয়ে ইসলামের পবিত্রতা রক্ষার্থে সমস্ত মুসলমানকে সংযমী থাকতে হয়,করুণাময় রহমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে দানধ্যান করতে হয়,ভালো কাজ করতে হয়,কোনও রকমের খারাপ কাজের সাথে লিপ্ত থাকা গুনাহ্ বলে দরা হয়।সেহর,ইফতার,পরে দাওয়াতের(নিমন্ত্রণ) সময়ে কোনও রকমের ভেদাভেদ রাখা যাবেনা।৷ একথা অমান্য করলে পরম করুনাময় আল্লাহ রুষ্ট হবেন।এই বিশেষ বিশ্বাস সকল মুসলিম মানুষের অন্তরে বিরাজ করে।

শতকের পর শতক ধরে চলে আসা এই রমজান মাসের রোজা পালনের সেই ঐতিহ্যপূর্ণ পরম্পরাকে মাথায় রেখেই সারাবিশ্বের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন একটি গান,১৯৩১ সালে। গানটি গেয়েছিলেন বাংলা সঙ্গীত জগতের অন্যতম ধ্রুবতারা,কাজী নজরুল ইসলামের একান্ত প্রিয়জন,শিষ্য লোকশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমেদ।
বলা যায়, এই আব্বাসউদ্দীন আহমেদ-এর অনুরোধেই সেদিন কাজী নজরুল ইসলাম এই গানটি লিখেছিলেন, সুর দিয়েছিলেন। তার আগে বাংলা ভাষায় পবিত্র ঈদোৎসব-এর কোনও গান ছিল না। এই গান সৃষ্টি হওয়ার পরে এক ইতিহাস তৈরি হয়েছিল বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন অনেক ভক্তিমুলক শ্যামাসঙ্গীত, ভজন, ইত্যাদি।

এইজন্য অনেক মুসলমান মানুষ নজরুলের বিরোধী ছিলেন।কিন্তু যখন সেই তিনিই লিখলেন ” ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ-রে…”,তখন তিনি আর কোনও সম্প্রদায়ের একার রইলেন না,হয়ে উঠলেন এক অসাম্প্রদায়িক মানুষ। এই গানটি কাজী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় HMV গ্রামাফোন রেকর্ড কোম্পানীতে আব্বাসউদ্দীন আহমেদের কণ্ঠে রেকর্ড হয়েছিল ১৯৩১ সালের ২৫ শে মে। এই গানে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম পবিত্র ঈদের,মানে ঈদ-উল্- ফিতর-এর আনন্দ এবং খুশীর কথা তুলে ধরেন। তুলে ধরেন ইসলামের ইতিহাস আর ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের কথা।আহ্বান জানান বিশ্ব মানবতার।

রমজান মাসের একমাসব্যাপী কঠোর কঠিন নিয়ম ব্রত “রোজা” পালনের শেষে আরবি ক্যালেন্ডারের দশম মাস “শাওয়াল” মাসের প্রথম দিনেই পালিত হয় খুশীর “ঈদ”। শুরু হয় ঈদোৎসবের নানাবিধ আনন্দের অনুষ্ঠান। পারস্পরিক ভালোবাসা কোলাকুলি, সালাম দেওয়া নেওয়া,মিষ্টিমুখ করা,দাওয়াত দেওয়া(নিমন্ত্রণ করা),দানধ্যান করা,ইত্যাদি ইত্যাদি। কাজী নজরুল ইসলামের সেই গানটি গাওয়া হোত এপার ওপার দুই বাংলার ঘরেঘরে। আজও গাওয়া হয় সেই গান। বহু অমুসলমান মানুষও এই বাংলার এই রমজান মাসের রোজা পালনের ব্রত পালন করে থাকেন। কারণ এই মহান ব্রত কারও শুধু একার নয়,এই ব্রত সকলের জন্য।পবিত্র কুরআন তাই বলে।

এই পবিত্র রোজা-রমজানের মাসে রইল সেই ৮৪ বছর আগে সৃষ্টি করা কাজী নজরুল ইসলামের সেই ঐতিহাসিক গানটি,—

” ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ রে, / তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে,শোন্,আসমানী তাগিদ রে,// তোর সোনাদানা,বালাখানা,সব রাহে লিল্লাহ্,/ দে যাকাত্, মুর্দা মুসলমানদের আজ ভাঙাইতে নিঁদ রে,/ ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ রে।।// আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন,সেই সে ঈদগাহে,/যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম্ হয়েছেন শহীদ রে,/ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ রে।।// আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন,হাত মেলাও রে হাতে,/ তোর প্রেম দিয়ে কর্ বিশ্ব-নিখিল ইসলামের মুরীদ্ রে,/ ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ রে।।// যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা,নিত্য উপবাসী,/ সেই গরীব, ইয়াতীম্ মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ্ রে,/ ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ রে।। // ঢাল্ হৃদয়ের তোর শতরীতে শিরনি তৌহিদের,/ তোর দাওয়াত কবুল করবেন হজরত,হয় মনে উম্মীদ্ রে,/ ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ রে,// তোরে মারলো ছুঁড়ে,জীবন জুড়ে,ইট-পাথর যারা,/সেই পাথর দিয়েই তোল্-রে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ রে,/ ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ রে।।// আপনাকে আজ বিলিয়ে দে,শোন্ আসমানী তাগিদ্ রে।।” (এই গানটির সুর ও ছন্দ নজরুল করেছিলেন কতকটা তাঁর গান আরবি, ইরানি সুরের রুমঝুম,রুমঝুম… /মোমের পুতুল… ইত্যাদি গানের সুর ছন্দের মতো।)

এই পবিত্র রোজা-রমজানের মাসে আমাদের সকল ভাই-বোন-বেরাদরদের জন্য রইল আসন্ন পবিত্র ঈদের আন্তরিক শুভেচ্ছা অভিনন্দন আর ভালোবাসা। কোনও প্রকারের সংকীর্ণতা যেন আমাদের সম্প্রীতিকে কলুষিত করতে না পারে। এই প্রার্থনা, দোয়া রইল।

সকলে ভালো থাকুন,সকলকে আপন করে সাথে নিয়ে,

অন্যের পাশে দাঁড়াবো,দেবো তার চোখের জল মুছিয়ে।।

এই হোক আহ্বান এই রোজা-রমজানের পবিত্র মাসে।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সম্পাদকের পছন্দ

টাটকা খবর

©2023 newsonly24. All rights reserved.