অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না-পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ অব্যাহত। শুক্রবারও দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গ—রাজ্যের একাধিক জেলায় সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের টাকা না পাওয়ার অভিযোগে বিক্ষোভ দেখালেন মহিলারা। কোথাও প্রশাসনিক দফতরের সামনে বিক্ষোভ, কোথাও আবার রেললাইন ও জাতীয় সড়ক অবরোধের জেরে জনজীবন ব্যাহত হল। পশ্চিম মেদিনীপুরে বিক্ষোভের মুখে পড়ে বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে এসে মহিলাদের সঙ্গে কথা বলতে হল মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে।
শুক্রবার পশ্চিম মেদিনীপুরে জেলাশাসকের দফতরে বৈঠক করতে গিয়েছিলেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। বৈঠক চলাকালীনই জেলাশাসকের দফতরের নীচতলায় জড়ো হন অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না-পাওয়া মহিলারা। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুপুর আড়াইটে নাগাদ বৈঠক ছেড়ে নীচে নেমে আসেন মন্ত্রী। সেখানে ছিলেন জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণা এবং স্থানীয় বিধায়ক শঙ্কর গুছাইতও।
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে অগ্নিমিত্রা বলেন, ‘‘একটু সময় দিন। সবে তো ১০০ দিন হয়েছে।’’ মন্ত্রী তাঁদের অভিযোগ শোনার পাশাপাশি জানান, সমস্যা সমাধানের জন্যই তিনি বৈঠক ছেড়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন। টাকা না-পাওয়া মহিলাদের এসডিও অফিসে গিয়ে নাম, ফোন নম্বর এবং এনরোলমেন্ট নম্বর জমা দিতে বলেন তিনি।
মন্ত্রী জানতে চান, জুন এবং জুলাই মাসে তাঁরা টাকা পেয়েছেন কি না। মহিলারা জানান, এক মাসের টাকাও তাঁরা পাননি। এরপর জেলাশাসককে একজন নোডাল অফিসার নিয়োগের নির্দেশ দেন অগ্নিমিত্রা। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, টাকা পাওয়ার জন্য তাঁদের এক দফতর থেকে অন্য দফতরে ঘুরতে হচ্ছে। এসডিও অফিসে গেলে পুরসভায় যেতে বলা হচ্ছে, আবার পুরসভায় গেলে এসডিও অফিসে পাঠানো হচ্ছে।
অগ্নিমিত্রা তাঁদের এসডিও এবং বিডিও অফিসে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন। মন্ত্রীর আশ্বাসের পর ধীরে ধীরে বিক্ষোভকারীরা জেলাশাসকের দফতর থেকে বেরিয়ে যান।
অন্যদিকে, উত্তর ২৪ পরগনার বিরাটিতে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না-পাওয়ার অভিযোগে রেললাইন অবরোধ করেন কয়েকশো মহিলা। এর জেরে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লোকাল ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। বিরাটি স্টেশনের শেষ প্রান্তে ফ্লাইওভারের নীচে জড়ো হয়ে রেললাইনে নেমে পড়েন তাঁরা।
দুপুর ১টা ৩৫ মিনিট নাগাদ হাসনাবাদ থেকে শিয়ালদহগামী ডাউন লোকাল বিরাটি স্টেশনে ঢোকার পরই দাঁড়িয়ে যায়। একাধিক ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। অবরোধকারীদের সঙ্গে যাত্রীদের বচসাও হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় রেল পুলিশ।
বিক্ষোভকারী মহিলাদের অভিযোগ, অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি জমা দেওয়ার পাশাপাশি একাধিকবার তথ্য যাচাইও হয়েছে। তাঁদের আবেদন অনুমোদিত দেখালেও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকেনি। অথচ অন্য অনেক উপভোক্তা ইতিমধ্যেই টাকা পেয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ২০ তারিখের মধ্যে টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও সেই সময়সীমা পেরিয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের। যোগ্য সকল উপভোক্তাকে টাকা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বিরাটির পাশাপাশি হাবড়াতেও অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না-পাওয়ার অভিযোগে বিক্ষোভ হয়। হাবড়া পুরসভার সামনে বিক্ষোভ দেখানোর পাশাপাশি রেললাইনও অবরোধ করেন মহিলারা। ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁরা বলেন, ‘‘অন্নপূর্ণা যোজনার নাম বদলে ‘ঢুকেছে কি ঢোকেনি’ রাখুন।’’
হাবড়ার বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সাইবার ক্যাফে থেকে ফর্ম পূরণ, পুরসভা ও বিভিন্ন দফতরে নথি জমা দেওয়া এবং বাড়িতে গিয়ে তথ্য যাচাই—সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরেও তাঁরা টাকা পাননি। তাঁদের দাবি, যোগ্য উপভোক্তাদের একসঙ্গে টাকা দিতে হবে। কোনও তথ্য যাচাই বাকি থাকলে দ্রুত সেই প্রক্রিয়া শেষ করে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
হুগলির চণ্ডীতলা-২ বিডিও অফিসেও একই অভিযোগে বিক্ষোভ দেখান মহিলারা। অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে তাঁরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত সমস্যার সমাধানের দাবি জানান।
বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরেও মহকুমাশাসকের দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখান মহিলারা। একসময় রাস্তা অবরোধ করে রাখেন তাঁরা। পরে বিষ্ণুপুর থানার পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। বিক্ষোভকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দ্রুত টাকা না পেলে আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনে নামবেন তাঁরা। একই দিনে বড়জোড়া বিডিও অফিসেও বিক্ষোভ হয়। সেখানে বাঁকুড়া-দুর্গাপুর রাজ্য সড়কও কিছু সময়ের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
উত্তরবঙ্গেও একই ছবি। আলিপুরদুয়ারের ধূপগুড়িতে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না-পাওয়ার অভিযোগে প্রায় ২০০ মহিলা জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন। ধূপগুড়ি থেকে ফালাকাটাগামী ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধের পাশাপাশি বিডিও অফিসেও বিক্ষোভ দেখান তাঁরা।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটের আগে বিজেপির তরফে লক্ষ্মীর ভান্ডারের উপভোক্তাদের মাসে ৩,০০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। পরে নানা শর্ত আরোপ করা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও যোগ্য উপভোক্তারা কেন টাকা পাচ্ছেন না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। অবরোধ তুলতে গেলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তির পরিস্থিতিও তৈরি হয়।
রাজ্যের একাধিক প্রান্তে একই দিনে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা নিয়ে বিক্ষোভের ঘটনায় প্রকল্পের টাকা বণ্টন ও যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি, যোগ্য উপভোক্তাদের বঞ্চিত না করে দ্রুত তাঁদের প্রাপ্য টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।