তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ভাঙন, বিদ্রোহ, নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অসন্তোষ— সব মিলিয়ে উত্তাল রাজ্য রাজনীতি। কিন্তু সেই বিদ্রোহীদের জমা দেওয়া চিঠিতেই উঠে এল এক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা করার দাবিতে স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই দলের ‘সভানেত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিদ্রোহী বিধায়করা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই একটি বিষয়ই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে বিদ্রোহীদের লড়াই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং দলের বর্তমান নেতৃত্বের একাংশের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে তাঁদের আপত্তিই এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
বুধবার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে জমা দেওয়া চিঠিতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা, সন্দীপন সাহা, জাভেদ খান ও শিউলি সাহাকে উপদলনেতা এবং আখরুজ্জামানকে মুখ্যসচেতক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। চিঠিতে ৫৮ জন বিধায়কের স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে চিঠিতে মমতার অবস্থান।
তৃণমূলের অন্দরে বর্তমানে যে সংঘাত চলছে, তার কেন্দ্রে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে সই জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর থেকেই দলের একাংশ প্রকাশ্যে অভিষেকের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কারের পর সেই অসন্তোষ আরও বাড়ে।
বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম মুখ বাগনানের বিধায়ক অরুণাভ সেনও কার্যত সেই বার্তাই দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, “আমি আজও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী হিসেবে মানি। কিন্তু কোনও দিনও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেতা মানিনি, মানব না, মানতে পারব না।”
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই মন্তব্য এবং বিদ্রোহীদের চিঠির ভাষা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তাঁরা নিজেদের ‘মমতাপন্থী’ হিসেবেই তুলে ধরতে চাইছেন। অর্থাৎ, সংগঠনের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব হিসেবে মমতার প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেই তাঁরা বর্তমান সাংগঠনিক ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— তৃণমূলের বর্তমান সংকট কি মমতা বনাম বিদ্রোহী শিবিরের লড়াই, নাকি অভিষেক বনাম বিদ্রোহীদের সংঘাত? বিদ্রোহীদের চিঠিতে ‘সভানেত্রী’ মমতার নাম উল্লেখ হওয়ায় দ্বিতীয় সম্ভাবনাই আরও জোরালো হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এখন নজর স্পিকারের সিদ্ধান্তের দিকে। তবে তার আগেই একটি বিষয় স্পষ্ট— তৃণমূলের বিদ্রোহীরা এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের সর্বোচ্চ নেত্রী হিসেবে মানছেন এবং সেই বার্তাই তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিধানসভার নথিতে তুলে ধরেছেন।