কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পদত্যাগের পর কলকাতা পুরসভাকে শোকজ নোটিস পাঠাল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর। কেন কলকাতা পুরসভার বোর্ড ভেঙে দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে পুর কর্তৃপক্ষকে তিন দিনের মধ্যে লিখিত জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই নোটিসের প্রতিলিপি কলকাতা পুরসভার কমিশনার, পুরসচিব এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আধিকারিকদের কাছেও পাঠানো হয়েছে। নোটিসে রাজ্য সরকার দাবি করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরসভা নাগরিক পরিষেবা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে এবং মেয়রের পদত্যাগের ফলে প্রশাসনিক কাজকর্ম আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দেন ফিরহাদ হাকিম। তবে এখনও পর্যন্ত তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে নতুন কোনও মেয়রের নাম ঘোষণা করা হয়নি। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়নি। এর পরই কলকাতা পুরসভাকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠায় রাজ্য সরকার।
নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে, মেয়রের পদ শূন্য থাকার ফলে পুরসভার স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং নাগরিক পরিষেবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে সংবিধান ও কলকাতা পুরসভা আইন, ১৯৮০ অনুযায়ী পুরসভার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
রাজ্য সরকার নোটিসে কলকাতা পুরসভা আইন, ১৯৮০-এর ১১৭(১) ধারার উল্লেখ করেছে। ওই ধারা অনুযায়ী, কোনও পুরসভা যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, ধারাবাহিকভাবে কর্তব্যে গাফিলতি করে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তাহলে সরকার তাকে অযোগ্য ঘোষণা করে ভেঙে দিতে পারে। তবে সেই ব্যবস্থা সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য কার্যকর করা যায়।
তবে একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী পুরসভাকে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দিতে হয়। সেই কারণেই ১১৭(২)(এ) ধারায় কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করে তিন দিনের মধ্যে জবাব চাওয়া হয়েছে। পুরসভার জবাব পাওয়ার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞ এবং কলকাতার প্রাক্তন মেয়র বিকাশ ভট্টাচার্য অবশ্য রাজ্যের এই পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, পুরবোর্ড সরাসরি ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাজ্য সরকারের নেই। সরকার পুরসভার কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারে, কিন্তু বোর্ড ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অন্যদিকে, কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সচ্চিদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, অতীতেও এমন পরিস্থিতির নজির রয়েছে। তাঁর মতে, মেয়র না থাকলে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে পুরবোর্ড ভেঙে না দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করে পুরসভার কাজ চালানো যেতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষ পরিষেবা পেতে কোনও সমস্যার মুখে না পড়েন।
আইন অনুযায়ী, যদি ১১৭ ধারার অধীনে পুরসভা ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে ১১৮ ধারা অনুসারে মেয়র, কাউন্সিলর এবং মেয়র-ইন-কাউন্সিলের সদস্যদের পদ শূন্য হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের নিযুক্ত প্রশাসক বা প্রশাসনিক কমিটি পুরসভার দায়িত্বভার গ্রহণ করবে।
ফলে কলকাতা পুরসভার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে এখন জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। পুরসভার জবাবের উপরই অনেকটাই নির্ভর করছে রাজ্য সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ।