প্রথম পাতা প্রবন্ধ এই সময়ের দাবির আর এক নাম— কাজী নজরুল ইসলাম

এই সময়ের দাবির আর এক নাম— কাজী নজরুল ইসলাম

10 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্য এবং সঙ্গীতের আকাশে চিরন্তন উজ্জ্বল উপস্থিতির নাম কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি শুধু বিদ্রোহের কবি নন, তিনি মানবতার কবি, তিনি সাম্য ও সম্প্রীতির স্থপতি, এক আপোষহীন রূপকার। কাজী নজরুলের চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনধারায়, জীবনযাপনে, তাঁর সাহিত্য, কাব্য এবং সঙ্গীত সৃষ্টিতে বারবার। যা আমাদের কাছে এক অনন্যসাধারণ আদর্শ, আমাদের জীবনে পথচলায় এক অমোঘ পাথেয়।

আমাদের বাংলা ও বাঙালির জীবনে বৈশাখে যেমন আসেন রবীন্দ্রনাথ, ঠিক তেমনই জ্যৈষ্ঠের রুদ্রদৃপ্ত তীব্র দাবদাহের দারুণ দহনদিনে সর্বহারার ধূমকেতু হয়ে এক হাতে নিয়ে বিষের বাঁশরী, আর এক হাতে রণতুর্য নিয়ে নিজের আগমনবার্তা জানিয়ে দেন যিনি— “বল বীর— বলো, উন্নত মম শির—”। “বিদ্রোহী রণক্লান্ত, আমি সেইদিন হবো শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না,/ বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত, আমি সেইদিন হবো শান্ত..”— তিনিই আমাদের কাজী নজরুল ইসলাম।

কাজী নজরুল তাঁর লেখনীতে বারবার ধর্মীয় সংকীর্ণতা, জাতিভেদে জাতের নামে বজ্জাতি, হিংসা-বিদ্বেষ প্রভৃতির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠে, আপোষহীন দৃঢ়তায় প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন।

তাঁর লেখায়, গানে আমরা দেখি, তিনি কখনো উদাস বিশ্বপথিক বাউলের মতো, এক মাতৃসাধকের মতো গেয়ে উঠছেন—
“আমার কালোমেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আজ আলোর নাচন/ রূপ দেখে শিব বুক পেতে দেয়, যার হাতে মরণ বাঁচন”, আবার সেই নজরুলই খুশির একতারায় মনের আনন্দে গেয়ে উঠছেন— “ও মন, রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ রে,/ আপনাকে আজ বিলিয়ে দে তুই, শোন্ আশমানী তাগিদ রে”। তাই আমাদের কাজী নজরুলের কাছে ধর্ম ছিল মানুষের কল্যাণের জন্য মানবিকতার শপথ, কোনও হিংসা, রোষ, বিদ্বেষ বা বিভেদের পথ নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন— “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”।

আমাদের এই দেশে, বিদেশে, সমাজে, জীবনের প্রাত্যহিকে নানা কারণে আজ যখন এক চরম অনভিপ্রেত অসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ক্রমশ বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে, তখন এই সময়ের দাবি, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন চেতনার দাবি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামকে। আজ যেন তাই বলতে চায় মন—
“সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনাতে নজরুল,/ যতই আসুক বিঘ্নবিপদ, হাওয়া হোক প্রতিকূল,/ একহাতে বাজে অগ্নিবীণা, কণ্ঠে গীতাঞ্জলি,/ হাজার সূর্য চোখের তারায় আমরা যে পথ চলি..”

হ্যাঁ, আমরা পথ চলি, আমরা পথ চলবো, যে পথের আদি-অনন্ত পথের নাম রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম।

সম্প্রীতি মানে শুধু একসঙ্গে বসবাস নয়, সম্প্রীতি মানে একে অপরের সুখদুঃখের দোসর হওয়া। এক নতুন অভ্যাস, সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা করা, যা সমস্ত রকমের সংকীর্ণতার সীমাবদ্ধতাগুলোকে ছিঁড়ে ফেলতে পারে। কারণ ধর্ম বা ধর্মীয় সংস্কার, রীতিনীতি কখনোই মানুষকে সৃষ্টি করে না, মানুষ ধর্মকে সৃষ্টি করে। মানুষই যুগে যুগে বিবর্তনের মাধ্যমে অভ্যাসে রপ্ত করে ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান। আর সমাজের এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী থাকে, তারা ধর্মকে সামনে রেখে তার সীমাবদ্ধতায় সহজ-সরল মানুষের মনে বিদ্বেষ-বিভেদের বিষের সঞ্চার করে।

তাই বিদ্রোহী লেখনীতে কাজী নজরুলের সেই চিরন্তন জিজ্ঞাসা—

“বলতে পারিস বিশ্বপিতা ভগবানের কোন্ সে জাত?/ কোন্ ছেলের তাঁর লাগলে ছোঁয়া অখুশি হ’ন জগন্নাথ?// তোরা ছেলের বুকে ছুরি মেরে/ ছেলের মুখে থু থু দিয়ে, মায়ের মুখে দিস ধূপের ধোঁয়া!!//”

কাজী নজরুল ইসলাম একটি লেখায় লিখছেন—

“টিকি-দাড়ির মোল্লা-পুরুতের ভজনায় আর প্রেরণায় যারা নেশায় মশগুল, তারা এই জিজ্ঞাসার জবাব কোনওদিন দেয়নি, দিতে পারবেও না।”

(আমার কৈফিয়ত / কাজী নজরুল ইসলাম)

তাই জ্যৈষ্ঠের কমলা রোদের ঝলমলানো আলোয় আর মাঝে মাঝে কালবৈশাখীর কৃষ্ণকালো মেঘেদের আনাগোনার এই সময়ে দাবির আর এক নাম— কাজী নজরুল ইসলাম।

তাঁর জন্মজয়ন্তী হোক বাঙালির বারোমাসের তেরো পার্বণের আর এক পার্বণ, ঠিক ২৫শে বৈশাখের মতো।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.