তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের সংকট আরও গভীর হল। এবার সরাসরি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে শর্ত রাখলেন বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম মুখ এবং প্রাক্তন মন্ত্রী তথা রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামান। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছাড়লে আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে আছি।”
বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলে শুরু হয়েছে ব্যাপক ভাঙন। দল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা-র নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে তথাকথিত ‘নব্য তৃণমূল’। বর্তমানে ৬৪ জন বিধায়ক নিয়ে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার দায়িত্বে রয়েছেন ঋতব্রত। মুখ্য সচেতকের পদে রয়েছেন আখরুজ্জামান। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, আগামী দিনে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এতদিন পর্যন্ত বিদ্রোহী গোষ্ঠী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি অস্বীকার করেনি। বরং তাঁকে দলের ‘মেন্টর’ হিসেবেই মেনে চলার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু তাঁদের আপত্তির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে সেই অবস্থান আরও স্পষ্ট করলেন আখরুজ্জামান।
তাঁর দাবি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের নেতৃত্বের কেন্দ্র থেকে সরানো হলে তাঁরা মমতার নেতৃত্বে কাজ করতে রাজি। অন্যথায় জোড়াফুল প্রতীক নিয়েই নতুন তৃণমূল গঠনের পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন। এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচনে তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়ক জয়ী হলেও তাঁদের মধ্যে ৬৪ জন বর্তমানে আলাদা ফ্রন্ট গঠন করেছেন। যদিও তাঁরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে দলত্যাগ করেননি কিংবা জোড়াফুল প্রতীকের দাবি তোলেননি। তবে বিধানসভার পাশাপাশি সংসদীয় দলেও ভাঙনের ইঙ্গিত মিলেছে। জানা গিয়েছে, ২২ জন বিদ্রোহী সাংসদও পৃথক ফ্রন্ট গঠনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন।
এরই মধ্যে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে যে তৃণমূল কংগ্রেস ভবিষ্যতে কংগ্রেসের সঙ্গে পুনরায় একীভূত হতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে বিদ্রোহী শিবিরের অবস্থান কী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মমতার উপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি দলীয় প্রতীক ও সংগঠনের উত্তরাধিকার নিজেদের হাতে রাখার বার্তাও দিতে চাইছেন বিদ্রোহী নেতারা।
উল্লেখ্য, তৃণমূলে এই বড়সড় বিদ্রোহের সূত্রপাত নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই। পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচন এবং সই-জালিয়াতি বিতর্ককে কেন্দ্র করে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। প্রথমে ৫৮ জন বিদ্রোহী বিধায়ক বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোসের কাছে চিঠি দিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার দাবি জানান। পরে স্পিকার সেই দাবি মেনে তাঁকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
তবে তখনও বিদ্রোহী নেতারা জানিয়েছিলেন, তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শ ও মেন্টরশিপ মেনে চলবেন। কিন্তু আখরুজ্জামানের সাম্প্রতিক মন্তব্যে স্পষ্ট, এখন বিদ্রোহী শিবিরের দাবি আরও কঠোর হয়েছে। তাঁদের বার্তা, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা জোড়াফুল—দলনেত্রীকে যে কোনও একটি পথ বেছে নিতে হবে।