প্রথম পাতা খবর খেলার মাঠ হারানোর গল্প, নীরবে চলে যাওয়া আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবসে এক অনুচ্চারিত প্রশ্ন

খেলার মাঠ হারানোর গল্প, নীরবে চলে যাওয়া আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবসে এক অনুচ্চারিত প্রশ্ন

6 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

২০২৬-এর, অর্থাৎ এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা যেদিন শুরু হল, সেই ১১ জুন ছিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস। প্রায় সকলের অজান্তে, অবহেলাতেই চলে গেল সে দিনটি। আমরা জানতেই পারলাম না।

স্মৃতি স্মরণের সরণিতে অব্যক্ত জিজ্ঞাসারা ছড়িয়ে পড়ে হয়তো সবার মনে— “কোথায় গেল আমাদের শৈশবের সেই খেলার মাঠ?” বিভিন্ন ধরনের তাদের নাম— কোথাও উদয়াচলের মাঠ, কোথাও তেঁতুলতলার মাঠ, কোথাও মণিমালার মাঠ, কোথাও হয়তো ভুবনডাঙার মাঠ, ইত্যাদি ইত্যাদি।

সেই বিকেলগুলো যেন জীবনের প্রতিদিনের যাপনের অধ্যায় থেকে উধাও হয়ে গেছে। বা বলা যায়, চুরি হয়ে গেছে।

যে মাঠের বুকে শৈশবের পরিচয়, স্কুলফেরত কৈশোরের দাপাদাপি, যৌবনের লুকোচুরিতে প্রেম, বার্ধক্যের আড্ডা ছিল অবধারিত এক জীবনের অঙ্গ।

হারিয়ে গেছে বাংলার সংস্কৃতি থেকে সেই সব খেলাগুলো, যেমন— কানামাছি, ড্যাঙ্গুলি, সাতচাড়া, গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা, চু-কিতকিত, ফিঙে, চোর-পুলিশ, বসন্তবৌরি, কুমিরডাঙা, শিরকামান, মার্বেল গুলি, লাট্টু-লাটিম, পিট্টু খেলা, ফুট টেনিস, ফুটবল, শীতকালের পাড়ার ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, ইত্যাদি ইত্যাদি কত কত খেলা।

আজ আর বিকেলের সেই বন্ধুদের ডাকাডাকি নেই, নেই আর মায়ের বকাঝকার ঝক্কিঝামেলা। একেকটা গ্রুপের কত তাড়াতাড়ি মাঠ দখলের আপ্রাণ মরিয়া চেষ্টায় থাকা— সব কেমন হারিয়েই গেল।

সব খেলার মাঠই যেন আজ উধাও। যে খেলার মাঠগুলো সামাজিকতার সাক্ষ্য বহন করে, শিশুমনের বিকাশ ঘটায়, বন্ধুত্বের সাতকাহন লেখে, পারস্পরিক সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্মৃতি তৈরি করে, দলগতভাবে, সমষ্টিগতভাবে “দশে মিলে করি কাজ”-এর সমবেত মানসিকতার জন্ম দেয়— সেই সব মাঠ আজকের বহুতলের কংক্রিট-মিক্সারের মুখে। কর্পোরেট নগরোন্নয়নের নীলনকশার শিকার।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবসের আহ্বান হল ১৮ বছরের কম বয়সিদের শরীর ও মনের বিকাশের জন্য খেলার অপরিহার্যতা। কিন্তু আজ ঠিক এই সময়েই সারা বিশ্বে খেলার মাঠ কমে যাচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, আমেরিকায় শেষ দশ বছরে খেলার মাঠ কমেছে ১,২৪০টি। ইউনাইটেড কিংডমে (ইংল্যান্ড) এই সংখ্যা প্রায় ৮০০। সারা ইউরোপের দেশগুলোতেও একই অবস্থা। এশিয়া মহাদেশেও তদ্রূপ।

আমাদের ভারতবর্ষে ১৪.৮ লক্ষ স্কুলের মধ্যে প্রায় ৭.৪ লক্ষ স্কুলে খেলার মাঠই নেই। তাই শৈশব-কৈশোরের মনের সেই চাহিদার শূন্যতায় প্রবেশ করছে ছোট্ট ছোট্ট হাতে ধরা মোবাইল ফোন। শৈশব, কৈশোর, যৌবন অভ্যস্ত হচ্ছে অনলাইন গেমিংয়ে। সেখানে কিন্তু মানুষ একা।

তাই বাড়ছে ডিপ্রেশন, বাড়ছে অ্যাংজাইটি, বাড়ছে নানান মনোরোগ। সে সব খেলায় পাশে কোনও বন্ধু নেই, সঙ্গী নেই, কেউ নেই। মনের কথা বলার দোসরও নেই, মনের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার কোনও শরিক নেই। শুধুই একাকীত্ব, একাকীত্বতা।

তাই ১১ জুন, সারা পৃথিবী জুড়ে বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতার উদ্বোধনের দিনেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবসের আহ্বান আমাদের যেন ডাক দিয়ে যায়— বেশি বেশি করে একসঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে বেঁচে থাকার কথা।

বাঁচিয়ে রাখতে হবে শৈশবের, কৈশোরের, যৌবনের আরামের পীঠস্থান সেই খেলার মাঠগুলোকে। বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাদের বিকেলগুলোকে।

শতাব্দীপ্রাচীন আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ধর্মগ্রন্থগুলির মতোই যে মাঠে-ময়দানে খেলা, সমাজ, রাজনীতি, রোমান্টিসিজম, অবসরের আড্ডা মিলেমিশে একসঙ্গে থাকার, একাকার হয়ে থাকার ভরসা, আস্থা আর আনন্দের মহামিলনের আস্তানা গড়ে তুলেছে, সেই খোলা নীল আকাশের নিচে এই পৃথিবীর সবুজ ঘাসে মোড়া নকশিকাঁথার মতো শীতলপাটির মাঠগুলিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

আমাদের জন্য, আমাদের প্রজন্মের জন্য, আমাদের বেঁচে থাকার জন্য।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.