প্রথম পাতা প্রবন্ধ শ্রীমা সারদা দেবী ও ভগিনী নিবেদিতা: নারীশিক্ষা, মাতৃত্ব ও এক চিরন্তন সম্পর্ক

শ্রীমা সারদা দেবী ও ভগিনী নিবেদিতা: নারীশিক্ষা, মাতৃত্ব ও এক চিরন্তন সম্পর্ক

14 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

১৮৯৮ সালের ২৮শে জানুয়ারি, কলকাতায় এলেন মিস এলিজাবেথ মার্গারেট নোবেল। এরপর ১৪ই ফেব্রুয়ারি এলেন মিস জোসেফাইন ম্যাকলাউড এবং মিসেস ওলি বুল। এঁরা এলেন ভারতবর্ষের মাটিতে স্বামী বিবেকানন্দের আহ্বানে। ততদিনে স্বামী বিবেকানন্দের কাছে পাঠ নিয়েছেন মিস নোবেল ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং পরম্পরার বিষয়ে। স্বামীজির লক্ষ্য ছিল ভারতের নারীশিক্ষা, নারী জাগরণের জন্য নিবেদিত প্রাণের মানুষ তৈরি করা। তাই ১১ই মার্চ স্টার থিয়েটারে হলভর্তি শ্রোতাদের সামনে পরিচয় করালেন মিস এলিজাবেথের উপস্থিতি এবং তাঁর বক্তৃতা—”ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং নারী জাগরণ”। সদ্য আগত বিদেশিনীর বক্তৃতায় সকলে মুগ্ধ। কিন্তু স্বামীজির সংকল্পে যে কাজ তখনও বাকি, সেই কাজ সমাধা হল ১৭ই মার্চ বাগবাজারে তিন বিদেশিনীকে নিয়ে গিয়ে শ্রীমায়ের শ্রীপদে নিবেদনের মধ্য দিয়ে। তারপর কী ঘটেছিল সেদিন?

সে এক অনন্যসাধারণ ইতিহাস। সেদিন মায়ের সে কী আনন্দ। স্বামী বিবেকানন্দ লিখছেন স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে—

“…ইউরোপীয় এবং আমেরিকান মহিলারা সেদিন তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। তারপর কী কাণ্ড ভাবতে পারো!!?—মা তাঁদের সঙ্গে একসাথে বসে কত কথা, একসাথে কী যত্ন করে খেতে দিলেন, এমনকি নিজেও খেলেন পর্যন্ত। দারুণ ব্যাপার নয় কি?”

এরপর ২৫শে মার্চ, ১৮৯৮, মার্গারেট নোবেলের স্বামী বিবেকানন্দের কাছে দীক্ষান্তে নামকরণ হল “ভগিনী নিবেদিতা”।

তখন গোঁড়া হিন্দু সমাজের পরিবেষ্টনীর মধ্যে অবস্থিতা, রক্ষণশীল সমাজের কঠিন কড়াকড়ি নিয়মবিধির মাঝেও শ্রীমা যথার্থ “বিশ্বজননী-জগজ্জননী” হিসেবে কাছে টেনে নিয়েছিলেন সেইসব বিদেশিনীদের। স্বামীজির আনন্দের সীমা নেই। স্বয়ং নিবেদিতা ২২শে মে, ১৮৯৮ তারিখের একটি চিঠিতে লিখছেন—”শ্রীমা আচারে-বিচারে বরাবরই রক্ষণশীল। কিন্তু তিনি সেইসব কিছু সরিয়ে দিলেন। আমরা যেতেই তিনি আনন্দে আমাদের কত আপন করে নিয়ে সমাদর করে খেতে দিলেন আদরের সঙ্গে নিজের হাতে ফল-মিষ্টি। শুধু তাই নয়, তিনিও আমাদের সঙ্গেই সেই ফল-মিষ্টি খেলেন একসাথে… বিস্মিত আমরা ধন্য হলাম, পবিত্র হলাম…।”

মিসেস ওলি বুল ১৮৯৮ সালের ৩০শে মে একটি চিঠিতে বিশ্ববরেণ্য দার্শনিক, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ম্যাক্সমুলারকে লিখছেন—”আমরাই এই বিশ্বের প্রথম বিদেশী ভাগ্যবান, যারা শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের পত্নী জগৎমাতা শ্রীমা সারদা দেবীকে দর্শন করার অনুমতি পেয়েছিলাম। তিনি প্রথম দেখাতেই—’আমার আদরের মেয়েরা’ বলে অতি ভালোবাসায়, স্নেহের সঙ্গে আপন করে নিয়ে আমাদের গ্রহণ করলেন। আমাদের একেবারেই অপরিচিতভাবে দেখলেন না। কী অভূতপূর্ব, কী অচিন্তনীয় সেই স্বর্গীয় মুহূর্ত।”

এরপর তো নিবেদিতা হয়ে গেলেন “আমার খুকী”, ওলি বুল হয়ে গেলেন “আমার মেয়ে”, আর শ্রীমা হয়ে গেলেন “Holy Mother” (মাতা দেবী/দেবী-মা)।

এদেশে স্ত্রীশিক্ষার ইতিহাসে এক বিশেষ ঘটনা হল ভগিনী নিবেদিতার বালিকা বিদ্যালয়ের উদ্বোধন ১৩ই নভেম্বর, ১৮৯৮, কালীপুজোর দিন। শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের পুজো করে শ্রীমা ওই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করেন। উপস্থিত ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী ব্রহ্মানন্দ, স্বামী সারদানন্দ প্রমুখ। শ্রীমা আশীর্বাদ করে বলেছিলেন—”আমি প্রার্থনা করছি, যেন এই বিদ্যালয়ের ওপর জগন্মাতার আশীর্বাদ বর্ষিত হয় এবং এখান থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত মেয়েরা যেন আদর্শ বালিকা হয়ে ওঠে।”

মা প্রায়শই সেখানে আসতেন। ছাত্রীরা মাকে পেয়ে খুশিতে মেতে উঠত। মায়ের বাগবাজারের বাড়ির কাছেই নিবেদিতার এই স্কুল। মায়ের নিত্য যোগাযোগ ছিল বলা যায়। প্রথম থেকেই বিদ্যালয়ের খরচ বহন করতেন ভগিনী নিবেদিতার পরিবারের সদস্য, ভাই স্যামুয়েল নোবেল, মিসেস ওলি বুল, মিস ম্যাকলাউড, উপেন্দ্রনারায়ণ দে, বিনোদবিহারী সোম, শ্রীমায়ের আদরের খোকা (বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু) প্রমুখ। হাওড়ার রামকৃষ্ণপুরের নবগোপাল ঘোষ নিবেদিতার স্কুলের জন্য দুটি ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে সেই গাড়িতে করে স্কুলের মেয়েদের নিয়ে স্বয়ং শ্রীমা-সহ নিবেদিতা ছুটির দিনে গড়ের মাঠে, চিড়িয়াখানায়, জাদুঘরে, হাওড়ার শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে (তখন নাম ছিল কোম্পানির বাগান), কালীঘাটে, হাওড়ার রামরাজাতলার রাম-সীতার মন্দিরে যেতেন।

শ্রীমা নীরবে বাংলা তথা ভারতের নারীশিক্ষায়, নারী জাগরণের পথিকৃৎ রূপে কাজ করে গেছেন, তা এই তথ্য থেকেই পাওয়া যায়।

শ্রীমা সেই তখনকার দিনে কতখানি সংস্কারমুক্ত ছিলেন, তার প্রামাণ্যতা পাওয়া যায় নিবেদিতার জীবনের একটি স্মরণীয়, বরণীয় ঘটনা থেকে। ঘটনাটি হল, একবার নিবেদিতা মায়ের কাছে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে, মা দেখিয়ে দেবেন, আর নিবেদিতা নিজের হাতে মায়ের সামনেই ভোগ রান্না করে শ্রী রামকৃষ্ণকে নিবেদন করবেন। মা মহানন্দে রাজি হয়েছিলেন। সেইমতো ভোগ রান্নাও হল। নিবেদন করা হল ঠাকুরকে। মা স্বয়ং সেই মহাপ্রসাদ গ্রহণও করলেন। কিন্তু রক্ষণশীল, সংকীর্ণমনা সমাজ, বিশেষ করে মহিলা মহলে খুব চাঞ্চল্য পড়ে যায়। অনেকেই মায়ের সেই কাজের খুব সমালোচনাও করতে থাকে। মা কিন্তু নির্বিকার, কারও কথায় কান দিলেন না, উপেক্ষাই করে গেলেন। বরং তিনি সোজাসুজি স্পষ্ট কথায় বলেছিলেন—

“নিবেদিতা, আমার খুকী, আমার মেয়ে, ঠাকুরকে নিজের হাতে ভোগ রান্না করে নিবেদন করার সম্পূর্ণ অধিকার তার আছে। তার দেওয়া প্রসাদ পরমানন্দে, কোনও বাধা-নিষেধ না রেখেই আমি গ্রহণ করেছি। যদি তাতে কারও কোনও আপত্তি থাকে, তবে সে নিজেকেই নিয়ে আবদ্ধ হয়ে থাক।”

এই হলেন আমাদের শ্রীমা। নিবেদিতা মায়ের সঙ্গে মন খুলে সব কথা বলার জন্যই বাংলা ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নি সরলা দেবীর কাছে, অবলা বসুর (জগদীশচন্দ্র বসুর স্ত্রী) কাছে, মৃণালিনী দেবীর (ঋষি অরবিন্দের স্ত্রী) কাছে। এমনকি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুও নিবেদিতাকে বাংলা ভাষা শিখতে সাহায্য করেছিলেন।

বিভিন্ন চিঠিতে যে তথ্য পাওয়া যায়, সেখান থেকে জানা যায় যে, শ্রীমা আর ভগিনী নিবেদিতা পরস্পরের সম্বোধনে ছিল এক অনন্যসাধারণ আন্তরিকতা। ১১ই এপ্রিল, ১৯০০ সালে শ্রীমা একটি চিঠি দিয়েছিলেন নিবেদিতাকে। সেটি বাংলায় লেখা, ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন স্বামী সারদানন্দ। সেখানে মা নিবেদিতাকে চিঠির শুরুতে সম্বোধন করেছিলেন—”স্নেহের খুকী নিবেদিতা”, আর শেষে ছিল—”তোমার মাতাঠাকুরাণী”। মায়ের সেই চিঠি পেয়ে নিবেদিতা ছোট্ট মেয়ের মতো আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন। মাকেও নিবেদিতা চিঠিতে সম্বোধন করেছিলেন—

“আমার আদরিনী মা-গো”,

চিঠির শেষে লেখেন—”তোমার চিরকালের বোকা খুকী!”

ভগিনী নিবেদিতা ছিলেন শ্রীমা সারদার আদরিনী প্রিয়তমা কন্যা, আর শ্রীমা ছিলেন নিবেদিতার—”আমার আদরের মা-গো”।

সমস্ত ব্যাখ্যার অতীত এক সম্পর্ক—মহাকালের নিয়তির অমোঘ বিধানের লীলাখেলায় শ্রীমা এবং ভগিনী নিবেদিতা ছিলেন বিনা সুতোর মালায় গাঁথা “মা ও মেয়ে”—এক অনন্যসাধারণ চিরন্তন বন্ধনের সম্পর্কে বাঁধা।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.