প্রথম পাতা প্রবন্ধ “শ্রীরামকৃষ্ণ নাম”—অমৃত সমান: দক্ষিণেশ্বর থেকে সর্বধর্ম সমন্বয়ের মহালীলা

“শ্রীরামকৃষ্ণ নাম”—অমৃত সমান: দক্ষিণেশ্বর থেকে সর্বধর্ম সমন্বয়ের মহালীলা

14 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

১৮৫২ সালে গদাধর চট্টোপাধ্যায় তাঁর বড়ো দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়কে সাহায্য করার জন্য কামারপুকুর থেকে দাদার সাথে কলকাতায় এলেন। সেই সময়ে দাদা রামকুমার একটি টোল পরিচালনা করতেন আর কয়েকটি বাড়িতে যজমানের ঘরে পূজাদি করতেন। এইভাবেই জীবিকা চালাতেন। ১৮৫৫ সালের ৩১ মে কলকাতার বিখ্যাত রাণী রাসমণি দেবী স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে বহু তিতিক্ষায়, প্রচেষ্টায় বহমান পবিত্র গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে দক্ষিণেশ্বরে দেবীমা ভবতারিণীর কালীমন্দির স্থাপনা করেন। সেইখানে দেবীমায়ের প্রতিষ্ঠা উপলক্ষ্যে রামকুমার পূজকের পদ গ্রহণ করেন। সেই উৎসবে সেদিন ছোটভাই গদাধরও উপস্থিত ছিলেন। নানান সংশয় তখন তাঁর মনে। তারপর নিজের কাছে নানান জিজ্ঞাসার উত্তর তিনিই খোঁজেন, এবং অবশেষে বহুকাল পরে তিনি দক্ষিণেশ্বরে চলে আসেন এবং দাদার অকাল প্রয়াণের পরে তিনিই মন্দিরে দেবীমায়ের পূজারীর পদে অধিষ্ঠিত হন। সে এক সমস্ত যুক্তি, তর্কের অতীত, এক অনন্যসাধারণ আধ্যাত্মিকতার মহালীলা।

এই সময়ে গদাধরের মধ্যে নানান পরিবর্তন, বিবর্তন ঘটতে থাকে। তিনি একাগ্রচিত্তে মায়ের প্রতি সম্পূর্ণ আবিষ্ট হয়ে মায়ের সাধনা অন্তরের অন্তঃস্থলে করতে থাকেন। বাইরের মানুষ সেই সাধনার বিচার করতো ভেদবুদ্ধির আচার-বিচারে তাদের সীমাবদ্ধ অজ্ঞানতায়।

পরমপুরুষ সেই বরিষ্ঠ মহাবতার স্বয়ং পরবর্তীতে বলছেন—”যখন মায়ের পূজো করতুম, তখন জিজ্ঞাসা করতুম, মা, তুই কি সত্যিই আছিস? না, সব মায়া? মিথ্যা? সব মনের ভুল? যদি তুই আছিস, তাহলে আমি তোকে দেখতে পাচ্ছি নে কেন?”

যতই দিন যেতে লাগলো, ঈশ্বরের জন্য গদাধরের তথা শ্রীরামকৃষ্ণের সেই ব্যাকুলতা ততই বাড়তে লাগলো, এবং দিনের মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টাই তিনি প্রার্থনা ও ধ্যান করেই কাটাতে লাগলেন। একদিন তিনি অত্যন্ত মরিয়া হয়ে উঠলেন। পরে এই অবস্থার কথা তিনি স্বয়ং শ্রীমুখে বলেছেন—”মায়ের দেখা পাবো না ভেবে প্রচণ্ড অভিমানে, যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলুম। অস্থির হয়ে ভাবলুম, তবে আর এ জীবনের আবশ্যক নাই। মায়ের ঘরে যে বড় খাঁড়া ছিল, দৃষ্টি হঠাৎ গিয়ে পড়ল তার ওপর। এক দণ্ডেই জীবন শেষ করে দেব ভেবে পাগলের মতো যেই ওটা ধরেছি, এমন সময়ে হঠাৎ মায়ের আলোয় আলোকময় এক অদ্ভুত দর্শন পেলুম আর সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলুম।”

এরপরে শ্রীরামকৃষ্ণের পক্ষে পূজাদি, মন্দিরের কাজ নিয়মিতভাবে করা অসম্ভব হয়ে উঠল। সেই সময়ে সেখানকার উপস্থিত সকলে, তাঁর আত্মীয়স্বজন সকলেই ভাবলেন এসব পাগলামি, অনাচার, আর বোধহয় তিনি বায়ুরোগগ্রস্ত হয়েছেন। তাই তাঁকে কামারপুকুরে নিয়ে যাওয়া হল, এবং ১৮৫৯ সালে কামারপুকুরের কাছেই জয়রামবাটি গ্রামের একটি ৬ বছরের কন্যা সারদামণি মুখোপাধ্যায়ের সাথে ২৪/২৫ বছরের গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের শুভ পরিণয় সুসম্পন্ন হল। ১৮৬০ সালে তিনি আবার ফিরে এলেন দক্ষিণেশ্বরে এবং পুনরায় জগজ্জননী দেবীমা ভবতারিণীর আকর্ষণে, এক মহাজাগতিক অলৌকিক মহালীলায় আবার আধ্যাত্মিক লীলায় ডুবে গেলেন। ঘর, সংসার, পরিবেশ—সব ভুলে গেলেন। এই সময়ে তাঁর কিরূপ অবস্থা হয়েছিল, তা পরে তিনিই স্বয়ং বলেছিলেন—”একটা আধ্যাত্মিক সঙ্কট কাটতে না কাটতেই আর একটা এসে উপস্থিত হতো। আশ্বিনের ঝড়ের মতো একটা কি এসে কোথায় কি উড়িয়ে নিয়ে গেল। হুঁশ নেই। কাপড় খুলেই পড়ে যাচ্ছে, তা পৈতে থাকবে কেমন করে? কেউ কিছু বললেই মুখ করতুম আকাশ-পাতাল জোড়া। আর খালি মায়ের কথা, আর মা মা করতুম। যেন মা-কে পাকড়ে আনছি। যেন জাল ফেলে মাছ হড়্হড়্ করে টেনে আনা। একদিন বকুলতলায় দেখলুম, নীল বসন পরে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে, বেশ্যা। দপ্ করে একেবারে উদ্দীপন। দেখলুম, মা স্বয়ং দাঁড়িয়ে। আবার একদিন, একটা সাহেবের ছেলে নজরে পড়ল, গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, ত্রিভঙ্গ হয়ে। যেই দেখা, দেখা মাত্র, দেখি অমনি শ্রীকৃষ্ণ আর যীশুর উদ্দীপন আমার এই দেহে ছড়িয়ে যাচ্ছে, জড়িয়ে যাচ্ছে। সমাধি হয়ে গেল, বাহ্যজ্ঞান নেই। সে এক ভারি অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপার। ভেদ-বিভেদ নেই। কুকুরের ওপরে চড়ে তার মুখে মায়ের লুচি ভোগ দিয়ে খাওয়াতুম, আর নিজেও তার মুখ থেকে খেতুম। যেন মায়ের মুখ থেকেই মায়ের প্রসাদ খাচ্ছি। কি অমৃত গো। লোকে ঘেন্নায় বলল, এঃ ম্যাগো, এঁটো খাচ্ছে দ্যাখো, কিন্তু তারা ভাবতেই পারলে না, মা শত সহস্র মুখে খান, ভেদবিভেদের নজরে যা দেখলে, তা ভ্রম গো। সবই ব্রহ্ম, এই জ্ঞান তাদের মুখেই সর্বস্ব, মনে মনে তারা মিথ্যে বিচারেই মজে আছে। যে ব্রহ্মজ্ঞানী, তার কাছে এঁটো বলে কিছুই নেই গো, সব এক, সব একাকার। তখন এই শরীর সংস্কারের দিকে মোটেই মন আদৌ না থাকায় মাথার চুল, গালের দাড়ি, বড় হয়ে ধুলোমাটি লেগে আপনিই জট পাকিয়ে গিয়েছিল। মায়ের ভাবনায় মন একাগ্র হয়ে থাকতো, শরীর এমন স্থির হয়ে যেত যে পাখীরা নিঃশঙ্কোচে মাথার ওপরে এসে বসে থাকতো…”

১৮৬১ সালে ভৈরবী ব্রাহ্মণী নামে এক তান্ত্রিক সন্ন্যাসিনী দক্ষিণেশ্বরে এসে শ্রীরামকৃষ্ণকে তন্ত্রসাধনায় দীক্ষা দিয়েছিলেন। পরে জটাধারী নামে এক বৈষ্ণব সন্ন্যাসীর কাছে তিনি প্রথমে মা যশোদা হয়ে বাৎসল্যভাব, পরে শ্রীরাধিকা হয়ে মধুর ভাবের সাধনা করেছিলেন। ১৮৬৪ সালে তিনি অদ্বৈতবাদী, দ্বৈতবাদী মহাযোগী তোতাপুরী নামে এক মহাজ্ঞানীর কাছে সন্ন্যাসমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেছিলেন। এই অবস্থায় মহাসাধক স্বয়ং ব্রহ্মের সাথে একাত্মতা প্রাপ্ত হন, শ্রীরামকৃষ্ণ সেই একাত্মতা প্রাপ্ত হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব রূপে প্রকট হন, প্রকাশ হন। ১৮৬৬ সালে শ্রীরামকৃষ্ণ ইসলাম ধর্মের সাধনা করেন সুফী সাধক ওয়াজেদ আলি খানের তত্ত্বাবধানে। এই ওয়াজেদ আলি খানের পূর্বনাম ছিল গোবিন্দ রায়। পরবর্তীতে ঠাকুর বলছেন সেই সময়ের কথা—”ঐ সময়ে ‘আল্লা’ কলমা জপ করতুম এবং সারাদিনে পাঁচবার নমাজ পড়তুম। মসজিদে যেতুম।” ১৮৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর দক্ষিণেশ্বরে যদু মল্লিকের উদ্যানবাটীতে শ্রীরামকৃষ্ণ সমাধিস্থ অবস্থায় যিশুখ্রিস্ট জননী এবং যিশুখ্রিস্টকে দর্শন করেছিলেন।

এর কয়েকদিন পরে পঞ্চবটীতে বেড়াতে বেড়াতে তিনি দর্শন পান তথাগত বুদ্ধদেব, মহাবীর, যিশুখ্রিস্ট, শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভু প্রমুখদের সূক্ষ্ম শরীরে। সকলেই লীন হয়ে গিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের পবিত্র ঐশ্বরিক পার্থিব শরীরে।

এইভাবে এই পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্মের আধ্যাত্মিক মহামানবদের সান্নিধ্য লাভ করে, নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে, সাধনায় পূর্ণ সাধিত হয়ে, তিনি তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত সেই চিরকালীন, চিরন্তন, শাশ্বত, সর্বধর্ম সমন্বিতা শ্রীবাণী আমাদের কাছে দিয়ে গেলেন—”যত মত তত পথ”।

যার অর্থ হল, যে যেভাবেই তার নিজ নিজ ধর্মকে আশ্রয় করে পথ চলতে পারে, কারণ পথের শেষে দাঁড়িয়ে আছেন সেই পরমেশ্বর, সেই পরমেশ্বরী—জগৎপিতা, জগৎজননী।

তাই আজ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব আমাদের অগ্রপথিক, তাঁর জীবন ও বাণী, তাঁর সাধনালব্ধ বিবরণ, কথা ও কাহিনী আমাদের কাছে অমৃত সমান।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.