প্রথম পাতা প্রবন্ধ শ্রীমা সারদা: বিশ্বময়ীর বিশ্বমায়ের আঁচলখানি তুমি

শ্রীমা সারদা: বিশ্বময়ীর বিশ্বমায়ের আঁচলখানি তুমি

15 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

১৯১৬ সাল। জয়রামবাটিতে মায়ের ঘরখানির অবস্থা খুবই খারাপ। মেরামত করতে হবে। অনেক চেষ্টাচরিত্র করে কিছু টাকা-পয়সা জোগাড় করে সেই ঘর তৈরির ব্যবস্থা করা হল। সেই কাজে লাগানো হল কাছাকাছি শিরোমণিপুর গ্রামের বেশ কয়েকজন খুব গরিব মুসলমান জনমজুর, ঘরামীকে। এরা আগে তুঁতের, রেশমকীটের চাষ করত। কিন্তু সেসব বন্ধ হয়ে গেছে বহুকাল। এই রকম দশা সেখানকার প্রায় সকলেরই। তারা পেটের দায়ে, দারিদ্র্যের চাপে অসাধু পথে চলে যায়। চুরি-ডাকাতি করতে শুরু করে। কথায় আছে না— “অভাবে স্বভাব নষ্ট”। যাই হোক, সেই তারাই এল মায়ের নতুন ঘরবাড়ি মেরামত করার জন্য। জয়রামবাটির গ্রামবাসীরা ভয়েতে জড়োসড়ো হয়ে ভাবতে লাগল। কেউ কেউ বলেও ফেলল— “এইবার এখানে চুরি-ডাকাতি বেড়ে যাবে গো, আর রেহাই নেই।”

ঘর মেরামতির কাজ চলছে। শ্রীমা মাঝে মাঝে আসছেন, দেখছেন, যারা কাজ করছে, তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। তারাও অনেক সময়ে কাজ ফেলে মায়ের মুখের কথা মন দিয়ে অবাক হয়ে শুনছে। তাদের আচারে-আচরণে আস্তে আস্তে কেমন যেন একটা পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। আশপাশের সন্দিগ্ধ মানুষ তা দেখছেন। তাদের মধ্যে তো রসিকতা করে কয়েকজন বলেই ফেললেন— “মায়ের কৃপায় এই ডাকাতগুলোও ভক্ত হয়ে গেল রে।” অবশ্য সেই কথাটার মধ্যে ভুল কিছু ছিল না। ডাকাত আমজাদ, রসুল আলি, বসির আলি, নাসির আলি প্রমুখরা সত্যিই কেমন যেন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছিল আস্তে আস্তে। তাদের বাড়ির মেয়েরা মায়ের জন্য খেজুরের রস, টাটকা সবজি ইত্যাদি নিয়ে আসত। মা-ও পরম আদরে তা গ্রহণ করতেন। তাদের দাম দিতে গেলে দাম তারা নিত না। মা বলতেন তাদের— “না গো, এ তো তোমাদের পরিশ্রমের পয়সা গো, না নিলে যে আমি দুঃখ পাব।” মায়ের সেই সুমধুর ব্যবহারে সেই মেয়েরাও আপ্লুত হয়ে যেত। মা তাদের কাছে বসিয়ে তাদের সংসারের সুখ-দুঃখের কথা শুনতেন, সমাধানের পথ বাতলে দিতেন। প্রসাদী ফল-মিষ্টি দিতেন খেতে। তারাও পরমানন্দে সেসব গ্রহণ করত। তাদের মনে হত, মায়ের কাছে যেন কী পরম শান্তি, কী স্নিগ্ধ শান্ত মায়ের কথাবার্তা, ব্যবহার! আরও কিছুক্ষণ যদি থাকা যায়! তারা কেমন যেন ভয়ে নয়, ভক্তির বিনিসুতোয় বাঁধা পড়ে গিয়েছিল।

আসলে মায়ের অন্তরের স্নেহ-ভালোবাসার দীক্ষায় তারা সত্যি সত্যিই মায়ের ভক্ত হয়ে গিয়েছিল।

একদিন ঘর তৈরির কাজ শেষ হয়ে যায়। তারপরও আমজাদ, রসুল আলিরা সকলেই তাদের সময়মতো আসত মায়ের কাছে।

একদিন দুপুরবেলা আমজাদ এসেছে। মায়ের মনে হল, সে কিছু খায়নি, অভুক্ত। তাই তাকে নতুন ঘরের মাটির দাওয়ায় খেতে বসিয়েছেন। পরিবেশন করছেন ভাইঝি নলিনী। নলিনীর ভীষণ শুচিবাই ছিল। অন্যদিকে শ্রীমা একেবারেই শুচিবাই পছন্দ করতেন না। বাইরের পোশাক, ছোঁয়াছুঁয়ি, নিজের-পরের— এই সব বাদ-বিচার মা একদম নিজেও করতেন না। অন্য কেউ তাই নিয়ে বাহুল্যতা করলে, তা মোটেই পছন্দ করতেন না। বরঞ্চ, তা অন্যদের মধ্যে দেখলে তিনি বলতেন— “মনের শুচিতাই বড় কথা।” কী পূজোর কাজে, কী প্রাত্যহিক জীবনে, সামাজিক আচার-আচরণে প্রভৃতিতে। এমনকি বৈধব্যের কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে যে শুচিবাই দেখা দেয়, শ্রীমা তাও একদম পছন্দ করতেন না। সে কথাও তিনি বলতেন। কাউকে কথায়, ব্যবহারে আঘাত দেওয়া তিনি পছন্দ করতেন না। আর এই সব কথা তিনিও কাউকে আঘাত দিয়ে বলতেন না, স্নেহ-মমতাপূর্ণ কথায় তাকে বলতেন, বোঝাতেন।

যাই হোক, সেদিন নলিনী আমজাদকে পরিবেশন করার সময়ে “স্পর্শদোষ” যাতে না হয়, সেই জন্য দূর থেকে ছুড়ে ছুড়ে খাবার পরিবেশন করছিলেন নলিনী। শ্রীমা আমজাদের সামনেই বসেছিলেন। নলিনীর ওইভাবে পরিবেশন করার ধরন দেখে তিনি বলেছিলেন— “ও কী রে? অমন করে দিলে মানুষের কি খেয়ে সুখ হয়? তুই না পারিস, আমি দিচ্ছি, দে দে আমায় দে।” এই বলে মা নলিনীর কাছ থেকে পরিবেশনের দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়ে নিলেন। বেশ যত্ন করে আমজাদকে পরিবেশন করে মা খাওয়ালেন নিজের হাতে। খাওয়া শেষ হলে আমজাদ নিজের এঁটো পাতা তুলে ফেলতে গেলে, মা নিজেই জল ঢেলে সেই জায়গাটা নিজের হাত দিয়ে পরিষ্কার করে দিলেন, যাকে এঁটো নিকোনো বলে। মা সেই কাজ নিজেই করলেন। নলিনী তা দেখে অবাক হয়ে বলে উঠলেন— “ও পিসিমা! এ কী করলে গো? তোমার তো জাত গেল গো!” শ্রীশ্রী মা সারদা তক্ষুনি এক ধমক দিয়ে বললেন— “আমি যে মা, আমার শরৎ যেমন ছেলে, আমার আমজাদও তেমন ছেলে।”

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই শরৎ হলেন স্বামী সারদানন্দজী মহারাজ।

জগজ্জননী শ্রীমা সারদার ভালোবাসার নকশিকাঁথার শীতলপাটিতে যেন তাই আমাদের বিশ্বময়ী বিশ্বমায়ের আঁচলখানি পাতা।

সেখানে রইল আমাদের অন্তরের পবিত্র প্রণামখানি।

আরও খবর

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.