পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
শরতের আর হেমন্তের বাংলা জুড়ে উৎসব। শারদীয়া দুর্গাপুজোর দশমীর বিজয়ার ঠিক চার দিন পরেই বাঙালির ঘরে ঘরে যে মন মাতানো উৎসব আনন্দের সাজে সেজে ওঠে, তার নাম লক্ষ্মীপুজো। এই লক্ষ্মীপুজো ‘কোজাগরী’ লক্ষ্মীপুজো নামেই আমাদের কাছে সমাদৃত।
কৈলাসে চলে যান দেবী মা দুর্গা বিজয়া দশমীর তিথিতে। আর যেতে যেতেই যেন রয়ে যান মহালক্ষ্মী দেবী, বাঙালির ঘরে ঘরে পুজিতা হবেন বলে।
এই মহালক্ষ্মী উত্থিতা হয়েছিলেন সমুদ্রমন্থনের মহাক্ষণে, পুরাণকথা তাই জানায়। আর এই মহালক্ষ্মী অষ্টলক্ষ্মী রূপে আটটি স্বতন্ত্র রূপে আবির্ভূতা হয়েছিলেন। যেমন,
‘আদি লক্ষ্মী’, ‘সৌভাগ্য লক্ষ্মী’, ‘ধান্য লক্ষ্মী’, ‘বিজয় লক্ষ্মী’, ‘ধন লক্ষ্মী’, ‘সন্তান লক্ষ্মী’, ‘বিদ্যা লক্ষ্মী’ ও ‘শ্রী লক্ষ্মী’।
কোজাগরী পূর্ণিমা তিথিতে এই অষ্টলক্ষ্মীর পুজোই হল কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। ‘কোজাগরী’ কথার অর্থ হল—‘কে জাগে?’ আজ কোজাগরী তিথিতে বাঙালির ঘরে-সংসারে ঘরের মহিলারা, যাঁরা নিজেরাই প্রতিটি সংসারে শ্রীমতী লক্ষ্মীশ্রী রূপে বিরাজিতা, তাঁরা সারাদিন উপবাসে থেকে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো সমাধা করার আয়োজনে ব্যস্ত থাকেন। তাঁরা নিজেরাই সারাদিন ধরে দেবী মা মহালক্ষ্মীর পুজো-পার্বণের জন্য নানা উপাচার সাজানো, নানা নৈবেদ্য সাজানো, নানান ব্যঞ্জন রান্না করা ইত্যাদি সব কাজ করেন। সন্ধ্যেবেলা শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো অনুষ্ঠিত হয় প্রতিটি বাড়িতে, আজকের দিনে।
আসলে এই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো যেন আমাদের ঘরে, আমাদের সংসারে শ্রী, সমৃদ্ধি এবং মঙ্গল কামনায় ব্রত হিসেবে পালন করেন আমাদেরই বাড়ির, আমাদেরই ঘরের লক্ষ্মীরা। দুর্গাপুজোর মণ্ডপে মণ্ডপেও লক্ষ্মীপুজো অনুষ্ঠিত হয়। মণ্ডপের সেই দেবী মা লক্ষ্মীর মুখের সঙ্গে আমরা মিল খুঁজে পাই আমাদের চেনা-পরিচিত, নিত্যদিনের সংসারের মা, বোন, কন্যা আর স্ত্রীর মুখখানির আদলের।
মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবীস্তোত্রে পাই—
“যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা,
নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।
যা দেবী সর্বভূতেষু নারী রূপেণ সংস্থিতা,
নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।
যা দেবী সর্বভূতেষু মহালক্ষ্মী রূপেণ সংস্থিতা,
নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ, নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।”
আজ কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর তিথিতে সকলের জন্য রইল দেবী মাতা মহালক্ষ্মীর কাছে শুভ ও মঙ্গল কামনার আন্তরিক প্রার্থনা।