প্রথম পাতা প্রবন্ধ শারদোৎসবের আনন্দে শোকের ছায়া

শারদোৎসবের আনন্দে শোকের ছায়া

14 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

পিতৃপক্ষের শেষ রাত পেরিয়ে দেবীপক্ষের প্রথম দিন, মহালয়ার ভোর। আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়ায় আগমনী সুর— “আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর, ধরনীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা।” শেষ রাতের ঘন নীল আকাশের বুকে ধীরে ধীরে কমলা আলো নিয়ে আসে সেই চিরপরিচিত সুর— “আজ প্রভাতে, সে সুর শুনে খুলে দিনু মন।”

পৃথিবীর যে প্রান্তেই এই সুর শোনা যাক না কেন, মনে হয় এ সুর সবার, এ সুর আমার, তোমার। আশ্বিনের রোদ্দুর গায়ে মেখে আকাশের আঙিনায় ঘুরে বেড়ায় খইসাদা মেঘের গাভির দল। বাতাসে শিউলির গন্ধ, দৃষ্টির সীমানায় সাদা কাশফুলের দোলন— সব মিলিয়ে এক মায়াময় উৎসবের আগমনী বার্তা।

কত দিন পর আবার কয়েকটি দিনের জন্য ঘরে ফিরবেন উমা। ভালোবাসায় ভরে ওঠে ঘর-বাহির, পুজোপ্রাঙ্গণ, আটপৌরে জীবনযাপনের অন্তরাত্মা।

ভালোবাসা এক আশ্চর্য শব্দ। সেই ভালোবাসাকে মনের ভাবনার সর্বাঙ্গে মেখে শরতের দিনলিপি তার পথের পাঁচালিতে লিখে রাখে মাতৃগাথা, মৃন্ময়ী দেবীর সাতকাহন। এই গাথার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান আমাদের চেনা-পরিচিত ঘরের মেয়েরাও। তাঁদের মধ্যেই যেন আমরা খুঁজে পাই সেই চিরন্তন উচ্চারণ— “যা দেবী সর্বভূতেষু নারী রূপেণ সংস্থিতা।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় লিখেছিলেন, “এই যে হেরি গো দেবী আমারি।” এ যেন ভালোবাসারই এক স্পর্ধিত উচ্চারণ— দেবী আমার, আমাদের। দেবী সবার, দেবী তোমার, দেবী আমার।

ভালোবাসতে শেখায় আমাদের এই শারদোৎসব। কাজী নজরুল ইসলামও আবাহন জানিয়েছিলেন নতুন মন্ত্রে জননীকে জাগিয়ে তোলার। যুগে যুগে পরিবর্তন এসেছে, বদলেছে উৎসব উদযাপনের ধরন, তবু দুর্গাপুজোর আনন্দ, আবেগ ও ঐতিহ্য আজও বহমান।

সর্বজনীনতার উৎসব দুর্গাপুজো

দুর্গাপুজো কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বাঙালির জীবন, সংস্কৃতি ও সামাজিক মিলনের এক অনন্য উৎসব। যুগস্রষ্টা স্বামী বিবেকানন্দ ভারতভ্রমণের সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে দেবীর নানা রূপ উপলব্ধি করেছিলেন। দরিদ্রের কুটির থেকে ধনীর প্রাসাদ— সর্বত্রই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন মানুষের মধ্যে দেবত্বের প্রকাশ।

বিশ্বজয় করে দেশে ফিরে ১৯০১ সালে শ্রীমা সারদাদেবীর পুণ্য উপস্থিতিতে বেলুড় মঠে দুর্গাপুজোর সূচনা করেন স্বামী বিবেকানন্দ। সেই ঐতিহ্য আজও বহমান। অন্যদিকে, সুভাষচন্দ্র বসুও সার্বজনীন দুর্গোৎসবের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯২৫ সালে মান্দালয় কারাগারে বন্দি থাকাকালীনও তিনি দুর্গাপুজো আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

আজ দুর্গাপুজো শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতবর্ষের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরাও এই উৎসবে শামিল হন। আমাদের কাছে দুর্গাপুজো তাই ঐতিহ্য, পরম্পরা, সম্প্রীতি এবং মানবিকতার এক জাগ্রত প্রতীক।

কিন্তু এই আনন্দের উৎসবের মাঝেই কখনও কখনও ঘটে যায় এমন কিছু ঘটনা, যা আমাদের সমস্ত আনন্দকে মুহূর্তে বিষাদে পরিণত করে।

চোরবাগানের বিপর্যয়: আনন্দের মাঝে গভীর শোক

বাস্তব জীবনে এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত, মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যায়, যা কোনওভাবেই সহজে মেনে নেওয়া যায় না। তেমনই এক বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটে গেল শারদোৎসবের মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপের কাছে।

পুজোর আনন্দে তখন মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের ঢল। ঠাকুর দেখার উৎসাহে ভিড় জমিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। কিন্তু সেই ভিড়ের চাপ, হুড়োহুড়ি এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার অভিযোগের মধ্যে পদপিষ্ট হওয়ার মতো মর্মান্তিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রাণ হারান অন্তত ১৯জন সহনাগরিক, আহত হন আরও অনেকে।

যাঁরা সেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন পুজো দেখে আনন্দের সঙ্গে ফিরে আসবেন বলে, তাঁদের অনেকেই আর ঘরে ফিরতে পারলেন না। নিয়তির নির্মম পরিহাস এবং মানুষের কিছু তাৎক্ষণিক অসতর্কতা ও অপরিণামদর্শিতার অভিযোগে উৎসবের আনন্দ পরিণত হল গভীর শোকে।

এ যেন হর্ষের মাঝে বিষাদ। এ যেন আগমনী উৎসবের মধ্যেই বিদায়ের কান্না, স্বজন হারানো পরিবারের বুকফাটা হাহাকার।

যে উৎসব ভালোবাসা, মিলন ও আনন্দের বার্তা বহন করে, সেই উৎসবের প্রাঙ্গণেই এমন বিপর্যয় আমাদের প্রত্যেককে ব্যথিত করে। মৃতদের পরিবারের কাছে এই ক্ষতি অপূরণীয়। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি। যাঁরা প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।

এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। উৎসবের আনন্দে আমরা অনেক সময় নিজের চারপাশের পরিস্থিতি ভুলে যাই। সামান্য আগে পৌঁছনোর তাগিদে ঠেলাঠেলি করি, ভিড়ের মধ্যে ধৈর্য হারাই, কখনও কখনও অন্যের নিরাপত্তার কথাও ভাবি না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্যক্তিগত আনন্দ-উচ্ছ্বাস কখনওই অন্যের ক্ষতির কারণ হওয়া উচিত নয়। ভিড়ের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, নির্দেশ মেনে চলা, বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ধাক্কাধাক্কি না করা এবং বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করা— এগুলি আমাদের প্রত্যেকের নাগরিক দায়িত্ব।

একই সঙ্গে পুজো উদ্যোক্তা, নিরাপত্তাকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনেরও দায়িত্ব রয়েছে। মণ্ডপের প্রবেশ ও বেরোনোর পথ, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা আগে থেকেই নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ ধরনের সর্বজনীন উৎসব যাতে আর কোনও দিন এমন মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার। পুজো কমিটি ও প্রশাসনের কাছে তাই আবেদন, নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন। মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনও উৎসব হতে পারে না।

মানবিক দায়বদ্ধতাই হোক আমাদের অঙ্গীকার

দুর্গাপুজো আমাদের শেখায় ভালোবাসতে, একে অপরের পাশে দাঁড়াতে এবং সমাজের সব স্তরের মানুষকে আপন করে নিতে। সেই শিক্ষাকে যদি আমরা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে না পারি, তবে উৎসবের প্রকৃত তাৎপর্যই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

আসুন, এই শারদোৎসবে আমরা প্রত্যেকে আরও সচেতন হই। নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি পাশের মানুষটির নিরাপত্তার কথাও ভাবি। কাউকে বিপদে পড়তে দেখলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই। প্রশাসন ও পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে নিরাপদ উৎসবের দাবি জানাই।

যাঁরা চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনায় প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আবারও জানাই গভীর সমবেদনা। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।

আনন্দের উৎসব হোক নিরাপদ, ভালোবাসার উৎসব হোক মানবিক। নিজের বিপদ এড়ানোর পাশাপাশি অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানোই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.