পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
আসল নামটা অনেকেরই অজানা। বিশ্বনাথ গজানন পাটেকরকে অবশ্য অধিকাংশ মানুষ চেনেন তাঁর ডাকনামেই—‘নানা পাটেকর’। মায়ের এক বন্ধুর স্নেহের দেওয়া এই নামই পরবর্তীকালে পরিচিতি পেয়েছে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জঞ্জিরায় জন্ম বিশ্বনাথ গজানন পাটেকরের। তাঁর মা সঞ্জনাবাঈ পাটেকর এবং বাবা দীনকর পাটেকর। ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। জীবনের শুরুর দিকে সিনেমার পোস্টার আঁকার কাজও করেছেন। সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কাজ করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের সংগ্রামেরই পরিচয় বহন করে।
গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ভর্তি হন মুম্বইয়ের স্যার জে জে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড আর্টে। পরে মারাঠি নাটকের মাধ্যমে মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রজগতে তাঁর যাত্রা শুরু। ধীরে ধীরে নিজের অভিনয় দক্ষতা ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের জোরে জায়গা করে নেন দর্শকের মনে।
‘অঙ্কুশ’, ‘সালাম বম্বে!’, ‘পরিন্দা’, ‘প্রহার’, ‘অঙ্গার’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘ওয়েলকাম’, ‘গুলাম-এ-মুস্তাফা’, ‘দিশা’, ‘তিরঙ্গা’, ‘কোহরাম’, ‘যুগপুরুষ’, ‘ওয়াজুদ’, ‘আজ কি আওয়াজ’, ‘প্রতিঘাত’, ‘মোহরা’, ‘আওয়াম’, ‘ত্রিশক্তি’ এবং ‘যশবন্ত’-এর মতো বহু ছবিতে নানা পাটেকরের অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে। কখনও কঠোর, কখনও আবেগপ্রবণ, কখনও বা রসবোধে ভরপুর—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে তাঁর সাবলীল অভিনয় তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।
অভিনয়ের পাশাপাশি কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে তাঁর। জনপ্রিয় অ্যানিমেটেড সিরিজ ‘দ্য জঙ্গল বুক’-এর হিন্দি সংস্করণে শের খানের চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। ২০১৩ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে নানা পাটেকরের স্ত্রী নীলকান্তি পাটেকর। তাঁদের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই আলাদা ছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েনের বাইরেও তিনি নিজের কাজ ও জীবনযাপনের সরলতার জন্য পরিচিত ছিলেন।
সমাজসেবার ক্ষেত্রেও নানা পাটেকরের অবদান উল্লেখযোগ্য। কৃষক ও গ্রামীণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে ২০১৫ সালে তিনি গড়ে তোলেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ অঞ্চলে কৃষক ও অসহায় মানুষের সহায়তায় এই সংস্থা কাজ করেছে। অভিনয়জীবনের সাফল্যের পাশাপাশি সমাজের প্রতি তাঁর এই দায়বদ্ধতাও তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর গোয়ার ডোনা পাওলোতে প্রয়াত হন নানা পাটেকর। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতে নেমে আসে শোকের ছায়া। পর্দায় তীব্র ব্যক্তিত্ব, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ভঙ্গি এবং চরিত্রের গভীরে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী অভিনেতা।
নানা পাটেকরের অভিনয় শুধু বিনোদন দেয়নি, দর্শককে ভাবিয়েছে, আলোড়িত করেছে। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। পর্দার সেই তেজস্বী অভিনেতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ মানুষটির স্মৃতির প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।
অভিনয়ের আকাশে নানা পাটেকর ছিলেন এক উজ্জ্বল অগ্নীশ্বর—যাঁর শিল্পসত্তার দীপ্তি দর্শকের মনে অমলিন থাকবে।