পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নক্ষত্রপুরুষ, নক্ষত্রের যাবতীয় মুদ্রাদোষ নিয়েই ইতিহাস তৈরি করেছেন। তাঁর মনে ছাতিম ফুলের গন্ধ, বিধুর শরৎ আর হেমন্ত সন্ধ্যায় নেমে আসে আনন্দ-মেশানো অবসাদ।
বাংলার জলাভূমিতে জল-তল-তটের বুকে আনমনা, উন্মনা ঢেউয়ের ছলাৎ-ছলাৎ দুলুনিতে লুটিয়ে পড়া কলমিলতার প্রেম, ভরদুপুরে অবসন্ন একাকী ডাহুকের কাতর ডাক কবির মরমে প্রবেশ করে, কবির কর্ণকুহর অতিক্রম করতে করতে। কেশবতী বঙ্গকন্যারা, বাংলার কিশোরীর নরম দুটি হাতের মায়াময় আঙুলে চাল ধোয়ানি জল, তার সেই আঙুল দিয়ে কপালে টিপ পরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, তার সেই পেলব খুশির হাতে ঘরের উঠোনে, বারান্দায়, শরৎ সন্ধ্যার আলপনার অঙ্কনি মুহূর্তগুলিতে জীবনানন্দ খুঁজে পান শান্তির আশ্রয়।
কবির নয়নতারায় বাংলার রূপকে তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়ানোর এক অন্তর্লীন ইচ্ছা। কোনও মুখরতা নয়, তিনি নির্জনতার এক দার্শনিক, একজন অন্তর্মুখী কবি। সেইভাবে দেখলে, তিনিই যেন একই অঙ্গে কিটস্, শেলি, কাফকা, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং স্বয়ং জীবনানন্দ।
শরৎ, হেমন্ত—এক কথায় প্রকৃতির এই সময়কাল উৎসবের। সেখানে মুখরতার প্রাধান্য বেশি। কিন্তু কবি জীবনানন্দ সেই স্বাভাবিক নাগরিক কোলাহলের মুখরিত মাতামাতি থেকে অনেক দূরে, নিরিবিলিতে একান্ত একা। কবির চেতনা জুড়ে শরৎকাল ধরা দেয় নৈসর্গিকী শান্তশ্রীতে। মনের অনুভব রূপান্তরিত হয় এক অনন্যসাধারণ স্নিগ্ধতায়, আসন্ন হেমন্তের এক বিষণ্ণ সৌন্দর্যের পটভূমিতে।
জীবনানন্দের সৃষ্টিতে শরৎ মানেই নীলদিগন্ত, আর খই-সাদা রঙের মেঘ-পালকের আপনমনে আপনহারা হয়ে ভেসে বেড়ানো আকাশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে।
কবির মনের দোসর হয়ে যায় অযতনে ফুটে থাকা নিসর্গচেতনায় নিঃসঙ্গ সাদা সাদা কাশফুল—রাশি রাশি। কবির সমস্ত দরদ ঝরে পড়ে রাত্রির গোপনীয়তায় নিবিড় গভীর আনন্দ নিয়ে ফুটে ওঠা শিউলির জন্য। যার প্রস্ফুটিত হওয়ার পরেই ভোরের মাটিতে মরণের সঙ্গে তার আলিঙ্গন যেন নিয়তির অমোঘ লীলা। প্রকৃতির বড্ড ভুল যেন এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের শিউলি ফুল, যেন প্রকৃতির বড্ড অভিমানী ফুল।
শারদীয়ার আবেশ মাখা বাংলার নদনদীর সখী শিপ্রা নদীর তীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়ে যাওয়া পথের প্রান্তে প্রান্তে শান্তিময়ী ধরনীর নকশিকাঁথায় উমারানীর আগমনী গান গেয়ে ওঠে পঞ্চতপা পৃথ্বী। এই বাংলার মাটি।
কবি তাই এই শরতের দুর্গাপূজাকে তথা শারদোৎসবকে সেই চোখ দিয়ে অনুভব করেন, যে চোখ জুড়ে শরতের আগমনীতেই বিদায় সুরে আনন্দ-বেদনার স্বরলিপি লেখা থাকে। শারদাকাশে, শারদপ্রাতে, উচ্চারিত স্তোত্রগীতি আর সুরগাথার যুগলবন্দীতে তিনি খুঁজে পান আশ্বিনের বিদায়গাথায় কার্তিকের আবাহন। বোধনের বাদ্যিতে তিনি শুনতে পান বিজয়ার বিদায়ের বিষাদী ভৈরবী।
কোজাগরীর পূর্ণচন্দ্রিমায় তিনি উদাসী ধানক্ষেতে খুঁজে পান বাংলার অমল সজল বর্ষার শেষে শস্যশ্যামলিমার ভরা যৌবনের রূপলাবণ্য। কার্তিকের নবান্নের দেশে তিনি খুঁজে পান অবশেষে নতুন ধানের সুমিষ্ট ঘ্রাণ। কার্তিকের অমাবস্যার ঘোর কৃষ্ণ অমানিশায় আতসবাজির উদ্দাম উল্লাসের উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বাসে জীবনানন্দ খুঁজে পান ধান্য-ঈশ্বরীর গর্ভবতী হওয়ার সূচনা।
জীবনানন্দের ‘শারদোৎসব’-এ তাই পাওয়া যায় অনালোচিত, অনালোকিত কবির সেই কবিতাখানি—
“মহামৈত্রীর বরদতীর্থে,
পুণ্য-ভারতপুরে,
পুজার ঘণ্টা মিশিছে হরষে নামাজের সুরে সুরে…
আহ্নিক যেথা শুরু হয়ে যায় আজান বেলার মাঝে…
জপে ঈদগাতে তসবি ফকির, পূজারী মন্ত্র পড়ে,
সন্ধ্যা-ঊষায় বেদবাণী যায় মিশে কোরাণের স্বরে স্বরে…
সন্ন্যাসী আর পীর,
মিলে গেছে হেথা—মিশে গেছে হেথা মসজিদ মন্দির।”
জীবনানন্দের অনুভবে উৎসব সমস্ত ধর্মের সীমানা পেরিয়ে মানুষের আটপৌরে জীবনের যাপনের ঘর-দুয়ারে, রাম-রহিমের মিলনক্ষেত্র হয়ে যায়। তিনি লেখেন ‘নব নবীনের লাগি’ কবিতায়—
“মানবের মাঝে যে দেবতা আছে, আমরা তাহারে বরি,
প্রাণের পূজার দেউলে তাহারই প্রতিমা গড়ি…।”
চন্দন-ধূপধুনোর সুবাসে তিনি খুঁজে পেয়েছেন মানুষের জয়গান। যেখানে কোটি কোটি মানুষের বুকেই দেবতার অধিষ্ঠান।
কবির অনুভব মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় মধ্যযুগের চণ্ডীদাসে—“সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।” মিলে মিশে একাকার হয় কাজী নজরুল ইসলামের—“গাহি সাম্যের গান”, মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের—“হে মোর চিত্ত, পুণ্যতীর্থ, জাগো রে ধীরে, এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে…।”
জীবনানন্দের চোখে শারদোৎসব তাই উৎসবের বহিরঙ্গের বিহ্বলতা নয়, উচ্ছ্বলতাও নয়। উৎসবের সমস্ত উচ্ছ্বাসের মধ্যেই থাকে যে গভীর নিবিড় মরমিয়া মর্মবোধ—সেই সহমর্মিতায় জীবনানন্দ মুখোমুখি হন নিজের অনুভূতির একান্ত একাকীত্বের নীরবতায়। সেখানে তখন উচ্চারিত হয়—
“তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ
অসতো মা সদ্গময়ঃ
মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়ঃ।”
তাই শারদোৎসবের আনন্দযজ্ঞে তিনি অগ্নিহোত্রী হয়ে, সমব্যথী হয়ে, আমন্ত্রণের আহ্বান জানান সর্বজনীনতাকে। এখানেই জীবনানন্দের একাকী ভাবনায় এবং দার্শনিকতায় বিশ্বজনীনতার তত্ত্ব।
যা আমাদেরও চিন্তায়-চেতনায় সত্যতা এবং অমর্ত্যতার আহ্বান জানিয়ে যায়। শরতের শিউলিফুলের আত্মবলিদান, সাদা কাশফুলের হিন্দোলিত বাতাস, আগমনী-মৌনমুখর আনন্দ-বিষাদ, বিজয়ার বিষণ্ণতা এবং মানুষের অসহায়তায় আজ এক বাস্তবতায় মিশে গেছে জীবনযাপন।
মানুষ আজ বড্ড কাঁদছে—তাই তার পাশে মানুষের প্রয়োজন। প্রয়োজন সেই আশ্বাস, সেই বিশ্বাসের নির্ভরতা, যেখানে একজন মানুষ আর একজন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আন্তরিকতায় বলবেন—“আনন্দে থাকুন, খুশিতে থাকুন—এই শারদোৎসবের সমস্ত আয়োজনই তোমায় ছাড়া বৃথা।”
এই সমানুভূতির অনুভব নিয়েই জেগে থাকুক শারদোৎসব এবং রূপসী বাংলার জীবনানন্দ। জাগ্রত থাক আমাদের বিশ্বাস ও চেতনা, আর বিশ্বজনীনতার সংস্কৃতির ঐতিহ্য ও পরম্পরা।