পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়
সুদূর আয়ারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ, বড় হয়ে ওঠা, নানান সমাজসেবায় ও নারীর শিক্ষার প্রসারে নিজেকে নিয়োজিত করা—এমনই এক অনন্যসাধারণ নারী স্বামী বিবেকানন্দের আহ্বানে ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেকে নিবেদিত করলেন সেই যুগের বিভিন্ন সমস্যায়, পশ্চাৎপদতায় জর্জরিত ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন ধারার সেবাব্রতে।
নারীশিক্ষার প্রসার ও প্রতিষ্ঠা, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শহরের অবহেলিত, দুঃস্থ মানুষের বস্তিতে বস্তিতে সেবা, পরাধীনতার নাগপাশ থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধের জাগরণ এবং ভুলিয়ে দেওয়া তথা ভুলে যাওয়া ভারতবর্ষের অতীত ঐতিহ্য, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরম্পরায় বহু যুগ ধরে প্রবাহিত যে ইতিহাস—সারা বিশ্বের কাছে অতীতে যে ইতিহাস ছিল পথ ও পাথেয়, আদর্শ, যার অন্বেষায় সারা বিশ্ব আসত এই ভারতের পুণ্যভূমিতে শিক্ষায় সুশিক্ষিত হওয়ার জন্য—সেই অতীত ইতিহাসকে পুনরায় দেশবাসীর অন্তরে দেশের প্রতি, ভারতাত্মার প্রতি শ্রদ্ধা ও বলিষ্ঠতায় বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা এবং পাশাপাশি সারা বিশ্বের সামনে সেই সব প্রামাণ্যতাকে পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত করে তুলে ধরা—ইত্যাদি ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র সাধ ও সাধনা। আর এই মহান কাজে যিনি নিজেকে উজাড় করে নিবেদিত করেছিলেন, সেই ভগিনী নিবেদিতার জন্মের ১৬০ বছর এবং মহাপ্রয়াণের ১১৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও আমরা সেই মহীয়সী নারীকে এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। ভগিনী নিবেদিতার ঋণ এই দেশে, এই দেশের সমাজে, এই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে, এই দেশের নারীশিক্ষার অগ্রগতিতে, বিজ্ঞানসাধনার পীঠভূমি বসুবিজ্ঞান মন্দির স্থাপনে কী অভাবনীয় অবদান রয়েছে, তার ইতিহাসই আমাদের কাছে আজও সর্বজনবিদিত হয়ে ওঠেনি। এ আমাদের লজ্জা। সেই অক্ষমতার মার্জনা ভিক্ষা করে, আজ বিশ্বনন্দিনী, ভারতবন্দিতা ভগিনী নিবেদিতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর শ্রীপাদপদ্ম স্পর্শ করে যাই।
পারিবারিক নাম ছিল মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল। তাঁর পুণ্য-পবিত্র জন্মের মহাক্ষণ ছিল ১৮৬৭ সালের ২৮ অক্টোবর, ইউরোপের আয়ারল্যান্ডের উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডানগানন-টাইরন অঞ্চলে।
মায়ের নাম ছিল মেরী ইসাবেল নোবেল এবং বাবার নাম ছিল স্যামুয়েল রিচার্ড নোবেল। শিক্ষালাভ, পরে নিজে শিক্ষয়িত্রী হিসেবে কাজ করা, সমাজসেবা করা—ইত্যাদি সবই আয়ারল্যান্ডেই শুরু করেন। পরে ১৮৯৫ সালে লন্ডনে বিশ্বজয়ী বিশ্বপথিক সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের একটি বক্তৃতাসভায় স্বামীজির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় তাঁর। প্রথম থেকেই স্বামী বিবেকানন্দের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনে অন্যান্যদের মতো তিনিও এক নতুন জগতের সন্ধান পেয়েছিলেন অন্তরে, চিন্তায়-চেতনায়। পরে তিনি আরও কয়েকজনের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের আহ্বানে ১৮৯৮ সালের ২৮ জানুয়ারি ভারতে আসেন ভারতবর্ষের তথা সারা বিশ্বের অসহায় মানুষের সেবায় কাজ করার ব্রত নিয়ে। থাকতে শুরু করেন বাগবাজারের ১৬ নম্বর এবং ১৭ নম্বর বোসপাড়া লেনে, জগজ্জননী শ্রীশ্রী মা সারদার সান্নিধ্যেই, তাঁরই ‘আমার আদরের খুকী’ হিসেবে, ‘আমার নরেনের মেয়ে’ হিসেবে। সেই বছরেই ২৫ মার্চ স্বামী বিবেকানন্দের কাছে ব্রহ্মচর্য দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং মানুষের সেবাব্রতে ব্রতী হওয়ার জন্য দীক্ষাপ্রাপ্তা হন। তখন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ মার্গারেটের নামকরণ করেন ‘ভগিনী নিবেদিতা’।
নিবেদিতার প্রথম কাজ হয়েছিল মেয়েদের জন্য শিক্ষার প্রচলন করা। এই কাজে অনেক বাধা, প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। নিবেদিতার সময়ে ভারতীয় সমাজ অত্যন্ত প্রাচীনপন্থী ছিল। অভিভাবকেরা বাড়ির মেয়েদের পড়াশোনার আদৌ পক্ষপাতী ছিলেন না। ১৮৯৮ সালেই নিবেদিতা শ্রীশ্রী মা, স্বামী বিবেকানন্দ-সহ অন্যান্য শ্রীরামকৃষ্ণ-সন্তানদের উপস্থিতিতেই নিজের বাসভবনে মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। বাগবাজারের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে নিজেই ছাত্রী জোগাড় করতেন। মেয়েদের ইতিহাস, ভূগোল, প্রকৃতিবিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি প্রভৃতি বিষয়ে পড়াতেন। তার সঙ্গে ছিল সেলাই, ছবি আঁকা, হাতের কাজ, গান, ব্যায়াম, শরীরচর্চা ইত্যাদি। এবং ছাত্রীদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ, আধ্যাত্মিকতার ভাবধারা জাগিয়ে দিতেন ও গল্পের মাধ্যমে ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচয় করাতেন।
শুধু ছোট ছোট মেয়েরাই নয়, বয়স্কা মহিলা, বিধবা মহিলারাও যাতে সমস্ত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন, তারও ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন। সেই সময়ে নিবেদিতার এই মহান কাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সমাজের কিছু কিছু শিক্ষিতা মহিলা নিবেদিতার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তাঁরা নিবেদিতার স্কুলে শিক্ষয়িত্রী হিসেবে মেয়েদের শিক্ষা দিতেন, নিবেদিতার অনুপ্রেরণায় স্বেচ্ছাব্রতী হয়ে।
সন্ধ্যেবেলা মাঝে মাঝে পাড়ার মেয়েদের আমন্ত্রণ করে সভা করতেন। বাড়ির উঠোনের ওপরে চৌকি পেতে তার ওপরে বসে স্বামী সারদানন্দ মহারাজ চণ্ডীপাঠ করতেন। কখনও কখনও শ্রীমা আসতেন। তিনি এসে উপস্থিত মহিলাদের নানান সামাজিক, সাংসারিক কাজে আধ্যাত্মিকতার প্রকাশ, মূল্যবোধ এবং করণীয়, পালনীয় বিষয়ে উপদেশ দিতেন। নিবেদিতা এবং ভগিনী ক্রিস্টিন ছোট ছোট মেয়েদের নিয়ে বসতেন উঠোনের এক ধারে। আর বয়স্কা মহিলারা বসতেন চিকের আড়ালে।
এই ইতিহাস থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, আমাদের সমাজের মেয়েদের এই শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন ভগিনী নিবেদিতা। তিনিই প্রথম স্কুলের মেয়েদের নিয়ে মাঝেমধ্যে বেড়াতে যেতেন।
নিবেদিতার আর একটি অধ্যায় হল, সেই সময়ে কলকাতায় মহামারি এক রোগের আক্রমণ নেমে এসেছিল—যার নাম প্লেগ। এই রোগে শত শত দরিদ্র, অসহায় মানুষ কলকাতার বিভিন্ন বস্তিতে, ঘিঞ্জি পাড়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেই সব মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন নিবেদিতা। তার একটি অনন্যসাধারণ ঐতিহাসিক প্রামাণ্য বিবরণ পাওয়া যায় সেই যুগের বিখ্যাত চিকিৎসক ডাক্তার রাধাগোবিন্দ করের (যাঁর নামে আর.জি. কর হাসপাতাল) একটি অভিজ্ঞতা থেকে। তিনি ভগিনী নিবেদিতার সেবার কাজ দেখে বিমোহিত হয়ে গিয়ে বলেছিলেন—
“আমি একদিন দেখি আমার বাড়ির দরজার সামনে এক দেবী বসে আছেন, কোলে তাঁর এক মৃত্যু-পথযাত্রী বালক। রোগের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে—‘মা, মাগো, আমায় ভালো করে দাও, মা—মাগো, আমায় বাঁচাও…’। আর সেই দেবী সেই বালকের সারা গায়ে, কপালে পরমস্নেহের হাত বোলাচ্ছেন। আমাকে দেখেই তিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে ইংরেজি ভাষায় অনুরোধ করে বলে উঠলেন, সেই বালকের চিকিৎসার জন্য। আমি বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে গেলাম। এক অপার করুণামণ্ডিত সৌন্দর্যে তাঁকে আমার মনে হল, তিনি স্বয়ং যিশু কোলে মাদার মেরি। মনে হল, এঁকে প্রণাম করি। তিনি বাধা দিলেন। শুধু অনুরোধ করলেন সারা মহল্লায় মহল্লায় রোগের সেবার জন্য। এক অনন্যসাধারণ প্রার্থনা। সেই ক্ষণেই হাত জোড় করে তাঁকে আমি প্রণাম জানিয়ে সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমি এই মায়ের এই সেবার কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করব, সেটাই হবে আমার একমাত্র ঈশ্বরের সেবা। তাই-ই করেছিলাম। পরে জেনেছিলাম, ইনিই আমাদের সকলের প্রণম্যা বিশ্বময়ী ভগিনী নিবেদিতা।”
আর্থিক অনটন ছিল নিবেদিতার সঙ্গী। তিনি লেখালিখি করে যেটুকু অর্থ উপার্জন করতেন, নিজের জন্য সামান্য রেখে বাকি সব সেবার কাজে, স্কুলের জন্য দিয়ে দিতেন।
নিবেদিতাকে অসীম স্নেহ এবং শ্রদ্ধা করতেন স্বয়ং শ্রীমা, স্বামী বিবেকানন্দের জননী ভুবনেশ্বরী দেবী। তাছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরলাদেবী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ ঠাকুরবাড়ির সকলেই, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, ব্যারিস্টার জানকীনাথ বসু (নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বাবা), আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, লেডি অবলা বসু (জগদীশচন্দ্র বসুর স্ত্রী), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং তাঁর স্ত্রী শ্রীমতী বাসন্তী দেবী, ডাক্তার আর.জি. কর, ডাক্তার নীলরতন সরকার, ডাক্তার ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার, ঐতিহাসিক রাধানাথ শিকদার, শিক্ষাবিদ যদুনাথ সরকার, শ্রীঅরবিন্দ, বারীন্দ্রনাথ ঘোষ, যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘা যতীন), ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, বিপ্লবী সংগঠনগুলির সমস্ত বিপ্লবী, স্বামী ব্রহ্মানন্দ, স্বামী সারদানন্দ-সহ বেলুড় মঠের সমস্ত সন্ন্যাসীবৃন্দ, স্বামী বিবেকানন্দের দুই ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত এবং মহেন্দ্রনাথ দত্ত, ফরাসি দার্শনিক রোমাঁ রোলাঁ, ইংরেজ চিন্তাবিদ চার্লস ফ্রেডেরিক অ্যান্ড্রুজ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ছিলেন সেই যুগের তাঁর পরিচিত ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্বদের মধ্যে।
অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে নিবেদিতার শরীর অতি অল্প বয়সেই ভেঙে পড়েছিল। তিনি বারবার অসুস্থ হয়ে পড়তেন। ১৯১১ সালে শুভাকাঙ্ক্ষী সকলের অনুরোধে নিবেদিতা জগদীশচন্দ্র বসু এবং তাঁর স্ত্রী লেডি অবলা বসুর সঙ্গে দুর্গাপুজোর সময়ে হিমালয় ভ্রমণে, শরীর ভালো করার আশায়, দার্জিলিং গেলেন। কিন্তু সেখানে আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। অবশেষে ১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর দার্জিলিংয়ের ‘রায় ভিলা’-তে ভগিনী নিবেদিতা মাত্র ৪৪ বছর বয়সে মহাপ্রস্থানের পথে চিরবিদায় নিলেন। চলে গেলেন শ্রীরামকৃষ্ণ-শ্রীমা-স্বামী বিবেকানন্দের স্নেহধন্যা ভগিনী নিবেদিতা পরমেশ্বর শ্রীরামকৃষ্ণলোকে।
লাঞ্ছিত, উৎপীড়িত, পদে পদে অপমানিত পরাধীন ভারতবর্ষকে আর কোনও বিদেশি ভগিনী নিবেদিতার মতো এত আপন করে নিয়ে ভালোবাসতে পারেনি। ভারতের ধর্ম, সংস্কৃতি নিয়ে এত গর্ববোধ, ভারতের জাতীয়তাবোধ জাগরণের জন্য এই রকম সর্বস্ব পণ—আর কোনও বিদেশি-বিদেশিনীর মধ্যে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। তাই ভগিনী নিবেদিতা একমেবাদ্বিতীয়ম, অনন্যসাধারণ, প্রণম্যা।
ভারতবর্ষকে ভালোবেসে, নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ভারতবর্ষের সেবায় নিবেদন করে, দীক্ষাগুরু স্বামী বিবেকানন্দের দেওয়া ‘নিবেদিতা’ নামটি তিনি যথার্থভাবেই সার্থক করে গেছেন। প্রণাম জানাই ভগিনী নিবেদিতার শ্রীপাদপদ্মে, শ্রীচরণে।