প্রথম পাতা প্রবন্ধ মহামায়া, মহাশক্তির অনন্য রূপ—‘দেবী কালী’

মহামায়া, মহাশক্তির অনন্য রূপ—‘দেবী কালী’

8 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

বিশাল এবং গভীর তাত্ত্বিকতায় ও দার্শনিকতায় মানবসভ্যতার সেই কোন প্রাচীন কাল থেকেই বলা যায়, প্রত্যক্ষভাবে আমরা স্বীকার করি আর নাই করি, আধ্যাত্মিকতার প্রভাব রয়েছে আমাদের জীবনে, চিন্তনে, মননে। এর স্বপক্ষে বোধহয় কথা বলতে পারে বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের ‘Black Hole’ বা ‘Big Bang’।

আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতায় অতি পরিচিত এবং আমাদের অন্তরের নির্ভরতায় রয়েছেন দেবাত্মবোধ। আর সেখানেই আছেন অন্যতমা আমাদের দেবী মা কালী। নানা সময়ে, নানান রূপে বা নানান উপচারে এই দেবী জগজ্জননী মা কালী পুজিতা হন আমাদের অন্তরের আবাহনে, ঘরে-বাইরে, মন্দিরে, মণ্ডপে।

কৃষ্ণকান্তিময়ী মায়ের ভুবনমোহিনী রূপ। যুগে যুগে এই রূপের অনন্ত, অশেষ ও চিরন্তন ব্যাখ্যা হয়েছে বিভিন্ন ঋষি, মুনি, সাধক, সাধু-সন্ন্যাসীর ব্যাখ্যানে। এমনকি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে এই মা কালী পুজিতা হন, আরাধিতা হন আমাদের অন্তরের আপ্যায়নে, যথাবিহিত উপচারে।

শুধুই কি আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গে? বোধহয় না। কারণ, জগজ্জননীর এই দেবী কালিকা রূপের উল্লেখ পাওয়া যায় কালিকা পুরাণে, নৈঋত পুরাণে, দেবী পুরাণে, ঋষি মার্কণ্ডেয় প্রণীত মার্কণ্ডেয় পুরাণে। পুরাণ ছাড়াও আমরা দেবী কালীকে পাই পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতায়, বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন সংস্কৃতিতে।

সুমেরীয় সভ্যতায় এক দেবী আরাধিতা হতেন, যিনি ছিলেন সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দেবী। তিনি অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতেন। হাতে ছিল অস্ত্র, আর তিনি রক্ষাও করতেন অসহায়দের। আমাদের দেবী কালীর মতোই তিনি ছিলেন কৃষ্ণকান্তিময়ী। তাঁর নাম ছিল ‘ইনান্নাকলি’। আক্কাদীয় সভ্যতায় সংহারিণী দেবীর নাম ‘ইশরাকালি’—তিনি শ্যামাঙ্গিনী ছিলেন। মনে করা হয়, তিনি শস্য বা ফসল উৎপাদনের দেবী ছিলেন। মিশরীয় সভ্যতায় আমরা কালিমায়ের রূপের সঙ্গে মিল পাই যে দেবীর, তিনি হলেন ‘সেখ্মেত্ লেভান্টাইন্’। আর ক্যানানীয় সভ্যতায় কালিকা দেবীর হুবহু দেবীর নাম ছিল ‘ক্যালিয়ানাত্’। এনার হাতে ছিন্ন নরমুণ্ড থাকত। রোমান সভ্যতায় ধ্বংস এবং অন্যায়ের সংহারিণী দেবী হলেন কালো বরণের ‘হেকেটিকা’ দেবী। অতি অতি প্রাচীন ইউরোপীয় জিপসি সভ্যতা ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশেষভাবে পুজিতা হন কৃষ্ণাঙ্গী দেবী—‘সারা-লা-কালী’ বা ‘কালিসারা’। দেবী কালিকাই বুঝি অন্য নামে পুজিতা হন ফিনল্যান্ড এবং শ্লাভিক বা শ্লোভাক সভ্যতায়, যথাক্রমে ‘কালমা’ এবং ‘শ্যামোরানা’ নামে। অনেক ঐতিহাসিক বলেন, তিব্বতে দেবী কালীর পুজো হয় যে দেবীর রূপে, তাঁর নাম হল—‘পালচেন্ লামা’। আদি সিন্ধু সভ্যতায় হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোতে পাওয়া যায় দেবী কালিকার মূর্তি। বৌদ্ধযুগেও কালীমায়ের আরাধনা হত—‘জারা’ নামে।

আমাদের বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে কালীমায়ের বিবরণ, মাহাত্ম্যের উল্লেখ পাই। কালীদর্পণ, দেবী পুরাণ, চণ্ডীমঙ্গল কাব্য, ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাংলা সাহিত্য-সংগীতে কালীমায়ের, শ্যামা মায়ের বন্দনা আমরা পাই।

যেমন, শ্রীচৈতন্য যুগের বিখ্যাত তন্ত্রসাধক সর্বানন্দ কালীকানন্দ আগমবাগীশের লেখা ‘কালী-কথা’তে দেবী কালিকার যে পরিচিত রূপ, তার উল্লেখ পাই। কালিকানন্দ লেখেন, দেবী দুর্গা যখন অশুভ শক্তি নিধনে উন্মত্ত, তখন তিনি প্রচণ্ড ক্রোধে রক্তবর্ণ হয়ে যান রক্তবীজকে নিধন করার জন্য। সেই রূপই আমাদের কাছে রক্তবর্ণা ঘনীভূত হয়ে হলেন, ‘কালো রূপে দিগম্বরী’ আমাদের পুজ্যা দেবী মা।

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের লেখা ‘অন্নদামঙ্গল’-এ পাওয়া যায় কালীমায়ের কথা।

কালী বন্দনা করেছেন যুগে যুগে বিভিন্ন সাধক, তান্ত্রিক, সন্ন্যাসী, সাধু-সাধ্বীবৃন্দ।

যেমন সাধক রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, গদাধর চট্টোপাধ্যায় তথা শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, তোতাপুরী, বামাচরণ চট্টোপাধ্যায় তথা বামাক্ষ্যাপা ওরফে বামদেব, ভবেন্দ্রমোহন রায়চৌধুরী তথা ভবা পাগলা, নলিনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় তথা স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী দেব, আত্মারাম ব্রহ্মচারী, ব্রহ্মানন্দ গিরি, প্রণব চট্টোপাধ্যায় তথা সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ, শ্যামাচরণ লাহিড়ী, বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী, শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী, নরেন্দ্রনাথ দত্ত তথা স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীমতী সারদামণি মুখোপাধ্যায় তথা শ্রীশ্রী মা সারদা, রানি রাসমণি দেবী, রাখালচন্দ্র ঘোষ তথা স্বামী ব্রহ্মানন্দ, প্রমুখ প্রমুখ সাধু-সাধ্বীবৃন্দ।

কালীমায়ের আকর্ষণ বাংলা সাহিত্য-সংগীতেও বিরাজমান। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রাজর্ষি’তে, ‘বাল্মীকি প্রতিভা’তে কালীমায়ের কথা বলেছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিভিন্ন লেখায় কালীমায়ের কথা পাই। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দেবী’ গল্পে কালীকথা পাই। সাধক কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনেক গানে আমরা কালীমাহাত্ম্য পাই—‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়, দেখে যা আজ আলোর নাচন…’, ‘বল রে জবা বল…’, ‘শ্যামা নামের লাগলো আগুন…’। সাধক কবি দাশরথী দে, মহারাজা এবং কালীসাধক হরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী, মির্জা হুসেন আলি মিয়াঁ—‘আমি কি তোদের ধার ধারি? / শ্যামা মায়ের খাস তালুকে বসত করি। / বলে মির্জা হুসেন আলি, / যা করেন আমার জয় মা কালী। / পুণ্যের ঘরে শূন্য দিয়ে পাপ নিয়ে যাও নিলাম করি।’ কমলাকান্ত ভট্টাচার্য লিখলেন, ‘জেনেছি জেনেছি তারা, তুমি জানো ভোজের বাজী…’, ‘শ্যামা মা কি আমার কালো রে, শ্যামা মা কি আমার কালো…’। রামপ্রসাদ সেন উত্তর কলকাতার গরানহাটায় জমিদারি সেরেস্তায় বসে লিখলেন—‘আমায় দে মা তবিলদারি, / আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী…’। আবার নদিয়ায় বসে লিখছেন—‘মন রে কৃষিকাজ জানো না, এমন মানবজমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা…’। রানাঘাটে দারিদ্র্যের মধ্যে লিখছেন—‘আমি চাই না মাগো রাজা হতে…’ ইত্যাদি ইত্যাদি। তথাকথিত ভিন্ন জাত-ধর্মের মাতৃসাধক বেলায়েত হোসেন লিখছেন মায়ের সাধনায় আপ্লুত হয়ে—‘কালী কালী বললে কালী, সহায় হন যে স্বয়ং কালী…’। আর এক কালীসাধক লিখেছেন মায়ের গান, বাউল গান। তিনি হলেন হাসন রাজা। নোয়াখালির (বাংলাদেশে) মেহের কালীবাড়ির সাধক কেয়ামত আলী মুন্সি গাইছেন—‘হরিকে কালী বলা ভুল, / কালীকে হরি বলা ভুল। / আমি ভেবে ভেবে পাগল হইলাম, / পাইলাম না তার মূলামূল।’ চট্টগ্রামের কালীসাধক শা বিরিদ খাঁ মা কালীর ভক্তিরসে বিভোর হয়ে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়ের মতো লিখে ফেললেন ‘কালিকা মঙ্গল কাব্য’। সাধক ভবানী দাস লিখলেন—‘অন্ন দে, অন্ন দে মা অন্নদাময়ী…’। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন—‘কালী কালী বলোরে…’ (‘বাল্মীকি প্রতিভা’)। সুদূর আয়ারল্যান্ডে জন্ম, কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দের কাছে দীক্ষিত হয়ে ভারতকে যিনি আপন করে নিয়েছিলেন, সেই ভগিনী নিবেদিতা উচ্চারণ করছেন কালীঘাট মায়ের মন্দিরে সেই সময়ের বিদগ্ধ মানুষদের সভায়—‘Kali—The Mother’।

আসলে আমাদের রক্তে, ভালোবাসায়, পরম্পরাতে, ঐতিহ্যে এক অনন্যসাধারণ ধারায় মিশে আছে আধ্যাত্মিকতা এবং আমাদের সনাতন শ্রদ্ধা, ধ্যান, আস্থা ও বিশ্বাস—যার নাম ‘মা’। তাই আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বীর বিপ্লবীরা দেবী দুর্গার, দেবী কালীর আরাধনা করতেন ভারতমাতা রূপে, দেশমাতৃকার রূপে, আপন ঘরের জননীর রূপে।

শুভ কালীপুজো, শুভ দীপাবলি।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.