প্রথম পাতা প্রবন্ধ এদেশের নারী শিক্ষায় ভগিনী নিবেদিতার কৃচ্ছ্রসাধন

এদেশের নারী শিক্ষায় ভগিনী নিবেদিতার কৃচ্ছ্রসাধন

11 views
A+A-
Reset

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল স্বামী বিবেকানন্দের আহ্বানে ভারতে এলেন ১৮৯৮ সালের এক শীতকালে।

স্বামী বিবেকানন্দ তার আগে এসেছেন, ফিরে সারা বিশ্বে নব চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে।

কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দের একটাই লক্ষ্য—পরাধীন দেশের, অসংখ্য কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, নানান অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতাকে সরিয়ে কীভাবে দেশের এই মরা জাতিটাকে জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত করা যায়, কীভাবে এই সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারী সম্প্রদায়ের শিক্ষা, আত্মসম্মানবোধ, আত্মবিশ্বাসকে জাগ্রত করা যায়। তাই তিনি ইউরোপে যখন পরিচিত হলেন মিসেস সেভিয়ার, মিসেস সারা বুল, মিস ক্রিস্টিন, মিস জোসেফাইন ম্যাকলাউড, মিস মার্গারেট নোবেল, প্রমুখদের সঙ্গে, তখন তিনি তাঁদের আহ্বান জানিয়েছিলেন ভারতে আসার জন্য, আর ভারতের নারীশিক্ষায়, নারীজাগরণে সেবাব্রতী হওয়ার জন্য। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েই ওনারা এলেন এদেশে। মিস মার্গারেট নোবেল গ্রহণ করলেন শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীমা সারদার সার্বজনীন মানবসেবার জন্য স্বামী বিবেকানন্দের কাছে শিষ্যদীক্ষা। হলেন ভগিনী নিবেদিতা। থাকতেন শ্রীমায়ের কাছে। শ্রীমায়ের অনুপ্রেরণাতেই তিনি শুরু করেন সমাজের পিছিয়ে পড়া, নানান সামাজিক অত্যাচার, বিধিনিষেধের নাগপাশে আবদ্ধ মহিলাদের শিক্ষার জন্য স্কুল।

নিবেদিতা যে বাড়িতে থাকতেন—কলকাতার বাগবাজারের ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেন—সেটিই হল নিবেদিতার স্কুল এবং বাসস্থান। পাশের বাড়ি ১৭ নম্বরে থাকতেন শ্রীমা সারদা। স্কুল প্রতিষ্ঠার দিন স্বয়ং শ্রীমা, স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী ব্রহ্মানন্দ, মিসেস সারা বুল, মিস ক্রিস্টিন, মিস ম্যাকলাউড, প্রমুখরা উপস্থিত ছিলেন সেখানে।

বাড়িটি তেমন স্বাস্থ্যকর ছিল না। গ্রীষ্মের গরমে শীতের দেশের মানুষ নিবেদিতার প্রচণ্ড কষ্ট হত। তবু তিনি খুশি মনে সহ্য করে গেছেন তা। ছাদটাও ছিল নিচু। তখন বৈদ্যুতিক আলো ছিল না। তিনি মেয়েদের পড়াতেন, নিজের পুজো-সাধনা করতেন, নিজে লেখালিখি করতেন, সেই ঘরেই। অত্যন্ত কষ্টসাধন করেই তিনি থাকতেন সেখানে। মাঝেমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন, ম্যালেরিয়াও হয়েছে বেশ কয়েকবার। অনেকে বলেছেন বাসস্থান পাল্টানোর কথা। তিনি তা শোনেননি। তিনি বলতেন, এই স্থান, এই বাড়ি আমার তীর্থ। তিনি বলতেন—“এই স্থানটি আমাকে দত্তক নিয়েছে, একে ছেড়ে আমি কোত্থাও যাব না”।

এর সঙ্গে ছিল স্কুল চালানোর জন্য আর্থিক কষ্ট। বইপত্র লিখে যা আয় হত, আর মিসেস সারা ওলি বুল যে অর্থ সাহায্য করতেন, তাই দিয়েই নিবেদিতাকে সব খরচ চালাতে হত।

যখন টানাটানি পড়ত, নিজের জন্য খরচের বিষয়টা কমিয়ে দিতেন যতটা সম্ভব। এমনকি শরীর রক্ষার জন্য যে সামান্য ব্যয়, তাও তিনি করতেন না। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর স্ত্রী লেডি অবলা বসু, যিনি দীর্ঘদিন নিবেদিতাকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন, তিনি বলেছেন—“ভগিনী নিবেদিতার প্রতিবেশীরা জানতেন, যে নিবেদিতার আয়ের বড় অংশ কিভাবে তিনি দুঃখীর প্রয়োজনে, ক্ষুধাতুরের ভোজনে, ব্যয়িত করতেন। নিজ নিতান্ত স্বাচ্ছন্দ্যকেও তিনি এর জন্য উৎসর্গ করতেন।”

রবীন্দ্রনাথ, শ্রীঅরবিন্দ, সরলা দেবী চৌধুরানী, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দের ছোট ভাই), প্রমুখরাও নিবেদিতার এই আত্মত্যাগের কথা স্মৃতিচারণে লিখে গেছেন।

রবীন্দ্রনাথ স্মৃতিকথায় বলেছেন—

“নিবেদিতা যে এই বিদ্যালয়ের ব্যয় বহন করিয়াছেন, তাহা চাঁদার টাকা হইতে নহে। উদ্বৃত্ত হইতেও নহে। একেবারেই উদরান্নের অংশ হইতে। ইহাই সত্য কথা।”

আজ এই সমাজের নারীরা শিক্ষায়, চিন্তাভাবনায় অনেক অনেক সাবলীল, স্বচ্ছন্দ। তারা স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছেন। মাথা উঁচু করে বলতে পারেন—“নারী কে আপন ভাগ্য জয় করিবার দিবে অধিকার, হে বিধাতা..”।

আর এই আত্মপরিচয় সগৌরবে বলতে পারার যে বলিষ্ঠতা, তার সূচনায়, বিনি সুতোর মালা গেঁথেছিলেন শ্রীমা সারদা, স্বামী বিবেকানন্দ স্নেহধন্যা এক বিদেশিনী আইরিশ কন্যা, ভারতের মানসতনয়া, লোকমাতা, অগ্নিময়ী, এদেশের নারীর জাগরণের অন্যতমা পথিকৃৎ ভগিনী নিবেদিতা।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.